সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি অফিসে ঢুকলেই অনেক সময় চোখে পড়ে একটি পরিচিত দৃশ্য। টেবিলের উপর ফাইল, পাশে কম্পিউটার, মাথার উপরে ফ্যান বা এসি, আর অফিসারের ঘরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারটির পিঠে ঝোলানো ধবধবে সাদা তোয়ালে।
প্রশ্ন জাগতেই পারে, চেয়ারে তোয়ালে দেওয়ার প্রয়োজনটা কী? আর কেন সেই তোয়ালে প্রায় সবসময় সাদা হয়?
এটি কোনও সর্বজনীন সরকারি নিয়ম নয়। বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, আবহাওয়া, পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন এবং পদমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রচলিত অভ্যাস। এই প্রথার সঠিক সূচনা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও সরকারি নথি নেই। তবে এর পিছনে কয়েকটি প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে।
চেয়ারের সঙ্গে মর্যাদার সম্পর্ক বহু পুরনো
চেয়ার শুধু বসার আসবাব নয়, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এটি ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাচীন মিশরে শাসকদের বিশেষ আসন ছিল। গ্রিস, রোম এবং চিনের মতো সভ্যতাতেও বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ও অলংকৃত আসনের ব্যবহার দেখা যায়।
সময়ের সঙ্গে রাজাদের সিংহাসন সাধারণ মানুষের ব্যবহারের চেয়ারে রূপান্তরিত হলেও, কে কোথায় বসবেন এবং কোন চেয়ার কার জন্য, সেই সামাজিক ধারণাটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
ভারতীয় সমাজেও বাড়ির প্রবীণ ব্যক্তি, শিক্ষক, জমিদার বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য আলাদা চেয়ার রাখার রীতি বহুদিনের। সরকারি প্রশাসনেও আসন অনেক সময় পদমর্যাদার দৃশ্যমান পরিচয় হয়ে ওঠে।
Read More : সরকারি স্কুলে ব্রেকফাস্ট ও মিড-ডে মিলের নতুন মেনু, সপ্তাহজুড়ে কী কী খাবার থাকবে?
ব্রিটিশ আমলে বদলে গেল চেয়ারের গুরুত্ব
সরকারি অফিসে সাদা তোয়ালে ব্যবহারের প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলির একটি ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।
ব্রিটিশ শাসনকালে সরকারি দফতরে পদমর্যাদার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য রাখা হতো। অফিসারের ঘর কোথায় হবে, টেবিল কত বড় হবে, কী ধরনের আসবাব থাকবে, কে কোথায় বসবেন, এমনকি অফিসে প্রবেশের ব্যবস্থাতেও গুরুত্বের পার্থক্য দেখা যেত।
এই পরিবেশেই উচ্চপদস্থ আধিকারিকের চেয়ারকে আলাদা করে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল বলে মনে করা হয়। সেই চেয়ারে সাদা তোয়ালে ব্যবহারের অভ্যাসও ধীরে ধীরে প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়।
শুধু ক্ষমতা নয়, এর পিছনে ছিল ব্যবহারিক কারণও
তবে সাদা তোয়ালেকে শুধুই ‘ক্ষমতার প্রতীক’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
একসময় ভারতের সরকারি অফিসগুলিতে আজকের মতো সর্বত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল না। প্রচণ্ড গরম, ধুলোবালি এবং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অফিসে পৌঁছানোর কারণে আধিকারিকদের ঘেমে যাওয়াটা ছিল স্বাভাবিক।
সেই সময়ে চেয়ারের পিঠে রাখা তোয়ালে ঘাম মুছতে কাজে লাগত। একইসঙ্গে এটি চেয়ারের আসবাবকেও ঘাম, ধুলো এবং ময়লা থেকে কিছুটা রক্ষা করত। পুরনো সময়ে চুলে তেল ব্যবহারের অভ্যাসও বেশি ছিল। ফলে মাথা ও পিঠের সংস্পর্শে চেয়ারে তেলের দাগ পড়ার সম্ভাবনাও থাকত। সহজে ধুয়ে ফেলা যায় এমন একটি তোয়ালে সেই সমস্যা কমাতে পারত।
অর্থাৎ শুরুতে এর পিছনে যথেষ্ট বাস্তব কারণ থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
তাহলে সাদা রং কেন?
এখানেও রয়েছে বেশ কিছু যুক্তি।
সাদা রঙে ময়লা বা দাগ দ্রুত চোখে পড়ে। ফলে তোয়ালে কখন পরিষ্কার করা প্রয়োজন, তা সহজেই বোঝা যায়। সাদা কাপড় ধোয়া এবং প্রয়োজনে ব্লিচ করে পরিষ্কার করাও তুলনামূলকভাবে সহজ।
এর পাশাপাশি সাদা রং পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও আনুষ্ঠানিকতার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে অফিসারের চেয়ারে একটি পরিষ্কার সাদা তোয়ালে চেয়ারের আলাদা গুরুত্বকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
কীভাবে তোয়ালে হয়ে উঠল ‘পাওয়ার সিম্বল’?
এখানেই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ।
যে জিনিসটি প্রথমে হয়তো ঘাম মোছা বা চেয়ার পরিষ্কার রাখার মতো ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকে ব্যবহৃত হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই পদমর্যাদার চিহ্ন হয়ে ওঠে।
একটি সরকারি অফিসে ঢুকে যদি দেখা যায়, একটি বড় ও আরামদায়ক চেয়ার সাদা তোয়ালে দিয়ে ঢাকা এবং তার সামনে বড় টেবিল, তাহলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই বুঝিয়ে দেয় যে ওই আসনটি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির।
অর্থাৎ তোয়ালেটি ধীরে ধীরে শুধু কাপড় থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে ‘এই চেয়ারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ একটি দৃশ্যমান সংকেত।
অনেক ক্ষেত্রে চেয়ার, টেবিল, ঘরের অবস্থান এবং আসবাবের মানের মতো বিষয়গুলিও প্রশাসনিক হায়ারার্কির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে সাদা তোয়ালে সেই দৃশ্যমান হায়ারার্কিরই একটি ছোট অংশ হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পরেও কেন এই প্রথা রয়ে গেল?
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু একটি দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি রাতারাতি বদলে যায় না।
পুরনো অফিস, পুরনো আসবাব, পুরনো কাজের ধরন এবং পুরনো অভ্যাসের অনেক কিছুই নতুন ব্যবস্থায় থেকে যায়। সাদা তোয়ালেও তার একটি উদাহরণ।
আজ সরকারি অফিসে কম্পিউটার এসেছে, অনলাইন ফাইল এসেছে, এসি এসেছে, আধুনিক রিভলভিং চেয়ার এসেছে। কিন্তু বহু জায়গায় সেই চেয়ারের পিঠে এখনও দেখা যায় পরিচিত সাদা তোয়ালে।
এখন কি সত্যিই তোয়ালের প্রয়োজন আছে?
আগের মতো প্রয়োজন হয়তো নেই। আধুনিক অফিসে এসি, উন্নত মানের চেয়ার কভার এবং সহজে পরিষ্কার করা যায় এমন আসবাব রয়েছে। তাই ঘাম বা চেয়ার রক্ষার জন্য তোয়ালে ব্যবহার করার প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে।
তবুও অভ্যাসটি টিকে আছে।
এর একটি কারণ হতে পারে ঐতিহ্য। আরেকটি কারণ হলো, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির চেয়ারকে আলাদা করে দেখানোর পুরনো সংস্কৃতি এখনও অনেক জায়গায় রয়ে গেছে।
এই কারণেই অনেকে সাদা তোয়ালেকে এখন ‘বাবু সংস্কৃতি’ বা ‘ভিআইপি কালচার’-এর প্রতীক হিসেবেও দেখেন। আবার অন্যদের কাছে এটি শুধুই পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবহারিক সুবিধার একটি পুরনো অভ্যাস।
সাদা তোয়ালে কি সত্যিই ক্ষমতা বোঝায়?
পুরোপুরি বলা যায় না। কারণ এর কোনও সর্বজনীন সরকারি নিয়ম নেই এবং সব সরকারি অফিসেও এই প্রথা দেখা যায় না।
তবে সামাজিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির দিক থেকে এর একটি প্রতীকী অর্থ তৈরি হয়েছে। একটি সাধারণ তোয়ালে কীভাবে কয়েক দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট ধরনের সরকারি চেয়ার, অফিসার এবং ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল, সেটিই আসলে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়।
অর্থাৎ তোয়ালেটি নিজে ক্ষমতা দেয় না, কিন্তু ক্ষমতার দৃশ্যমান সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
ব্রিটিশরা চলে গেলেও অভ্যাসটি রয়ে গেল
এই পুরো বিষয়টির মধ্যে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সময় বদলেছে, প্রশাসনের পদ্ধতি বদলেছে, অফিসের প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু কিছু প্রতীকী অভ্যাস এখনও রয়ে গেছে।
সাদা তোয়ালে তারই একটি উদাহরণ।
একসময় হয়তো এটি ছিল গরমে ঘাম মোছার প্রয়োজনীয় জিনিস। পরে এটি চেয়ার পরিষ্কার রাখার উপায় হয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে উঠেছে পদমর্যাদা ও গুরুত্বপূর্ণ আসনের পরিচয়।
তাই পরের বার কোনও সরকারি অফিসে গিয়ে কোনও বড় চেয়ারের পিঠে সাদা তোয়ালে দেখলে সেটিকে শুধু একটি কাপড় হিসেবে দেখবেন না। এর মধ্যে ভারতের প্রশাসনিক ইতিহাস, ঔপনিবেশিক আমলের কর্মসংস্কৃতি, গরম দেশের বাস্তবতা এবং ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক, সবকিছুরই কিছুটা ছাপ রয়েছে।
এক টুকরো সাদা তোয়ালে, অথচ তার গল্পটা ভারতের প্রশাসনিক সংস্কৃতির কয়েক দশক জুড়ে।
