সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
Karnataka High Court on Wife’s Rights: বিয়ের পর স্ত্রী কি স্বামীর বাবা-মায়ের দেখাশোনা করতে বাধ্য? নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে যেতে কি স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অনুমতি প্রয়োজন? এই ধরনের প্রশ্ন ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কর্ণাটক হাইকোর্ট।
বিয়ে মানেই কি নিজের ইচ্ছা, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপর নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া? সংসারের যাবতীয় কাজ কি স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রীর দায়িত্ব? আর শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব কি বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুত্রবধূর উপর চলে আসে?
একটি ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এই প্রশ্নগুলিই সামনে আসে কর্ণাটক হাইকোর্টে। বিচারপতি ড. চিল্লাকুর সুমলতার বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, স্ত্রীকে বাড়ির কাজ করতে বা স্বামীর বাবা-মায়ের দেখাশোনা করতে জোর করা যায় না। সংসারের কাজ পুরুষ ও মহিলা দুজনেরই ভাগ করে নেওয়া উচিত।
আদালত আরও বলেছে, একজন মহিলাকে নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অন্য কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
Karnataka High Court on Wife’s Rights: কী নিয়ে মামলা?
ঘটনাটি একটি দাম্পত্য ও ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলাকে কেন্দ্র করে। নেলমঙ্গল এলাকার এক ব্যক্তি তুমাকুরুর পারিবারিক আদালতের একটি নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কর্ণাটক হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
পারিবারিক আদালত তাঁকে স্ত্রীকে মাসে ৫ হাজার টাকা এবং নাবালিকা মেয়েকে ৪ হাজার টাকা, অর্থাৎ মোট ৯ হাজার টাকা মাসিক ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। হাইকোর্টে সেই নির্দেশের বিরোধিতা করেন স্বামী।
স্বামীর দাবি ছিল, তিনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বও তাঁর উপর রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিয়ের প্রায় ছয় মাস পর স্ত্রী তাঁর বাবা-মায়ের প্রতি আগের মতো আগ্রহ দেখাতেন না। বাড়ির কাজ করতেন না এবং শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনাও করতেন না।
এমনকি স্ত্রী তাঁর বা তাঁর বাবা-মায়ের অনুমতি না নিয়েই নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে একাধিকবার চলে গিয়েছেন বলেও তিনি আদালতে দাবি করেন।
নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে যেতে অনুমতি কেন?
স্বামীর এই বক্তব্যের একটি অংশ নিয়েই বিশেষভাবে প্রশ্ন তোলে হাইকোর্ট।
আদালতের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাকে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বা তাঁদের বাড়িতে যেতে শ্বশুরবাড়ির সবার অনুমতি নিতে হবে, এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিচারপতি চিল্লাকুর সুমলতা প্রশ্ন করেন, কেন একজন ভারতীয় মহিলাকে নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে যাওয়ার মতো একটি মৌলিক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জন্য শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অনুমতি নিতে হবে?
অর্থাৎ, বিয়ে হয়েছে বলেই একজন মহিলার নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বা তাঁদের কাছে যাতায়াতের স্বাধীনতা শেষ হয়ে যায় না।
শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা কি পুত্রবধূর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব?
এখানেও আদালতের বক্তব্য যথেষ্ট স্পষ্ট।
হাইকোর্ট বলেছে, বাবা-মায়ের দেখাশোনার প্রাথমিক দায়িত্ব তাঁদের নিজের ছেলে বা মেয়ের। পুত্রবধূ বা জামাইয়ের উপর সেই দায়িত্ব জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পুত্রবধূ কখনও শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা করবেন না। আদালত বলেছে, ভালোবাসা, পারিবারিক সম্পর্ক বা স্বেচ্ছায় কেউ সেই দায়িত্ব নিতে পারেন। কিন্তু সেটিকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া যায় না।
এই পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতীয় পরিবারে অনেক সময় বিয়ের পর পুত্রবধূর কাছ থেকে শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনাকে স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে আশা করা হয়।
Karnataka High Court on Wife’s Rights: বাড়ির কাজ কি শুধু স্ত্রীর দায়িত্ব?
এই প্রশ্নেও আদালত প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
কর্ণাটক হাইকোর্টের বক্তব্য, সংসারের কাজ স্বামী ও স্ত্রী দুজনের মধ্যে ভাগ হওয়া উচিত। একজন স্বামী তাঁর স্ত্রীকে শুধু স্ত্রী হওয়ার কারণে বাড়ির যাবতীয় কাজ করার নির্দেশ দিতে পারেন না।
অর্থাৎ রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবারের দৈনন্দিন কাজ কিংবা অন্য গৃহস্থালির দায়িত্বকে শুধুমাত্র নারীর দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
“স্ত্রী যেন কর্মচারী” এমন ধারণা কেন উঠল?
মামলায় স্বামীর দেওয়া বক্তব্যের ধরন নিয়েও আদালত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে।
স্ত্রী বাড়ির কাজ করেননি, তাঁর বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেননি এবং অনুমতি ছাড়া নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে চলে গিয়েছেন, এই অভিযোগগুলির সামগ্রিক ভাষা আদালতের কাছে এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে স্বামী যেন স্ত্রীকে বাড়ির কাজ ও তাঁর বাবা-মায়ের দেখাশোনার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন।
আদালত এই ধরনের মানসিকতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণে, বিয়ে কোনও ব্যক্তিকে তাঁর সঙ্গীর আচরণ, ইচ্ছা বা স্বাধীনতার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয় না। দাম্পত্য সম্পর্কের অর্থ এক পক্ষের অন্য পক্ষের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়।
বিয়ে মানেই কি নিজের স্বাধীনতা হারানো?
এই মামলার সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত এখানেই।
হাইকোর্ট বলেছে, একজন মহিলার নিজের ক্যারিয়ার, অর্থনৈতিক বিষয় এবং ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। বিয়ের পর সেই ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে যায় না।
আদালতের ভাষায়, বিয়ে কোনও ব্যক্তিকে তাঁর সঙ্গীর ব্যক্তিসত্তা, স্বাধীনতা ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশ বা দমন করার লাইসেন্স দেয় না।
একই সঙ্গে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, একজন স্ত্রীর পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধকে শুধুমাত্র তাঁর আনুগত্য বা সব কথা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে বিচার করা যায় না।
Karnataka High Court on Wife’s Rights: তাহলে ৯ হাজার টাকার ভরণপোষণের কী হল?
স্বামী পারিবারিক আদালতের দেওয়া মাসিক ৯ হাজার টাকার ভরণপোষণ কমানোরও আবেদন করেছিলেন।
কিন্তু হাইকোর্ট সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। বরং আদালত উল্লেখ করেছে, স্ত্রী ও মেয়ের জন্য মোট ৯ হাজার টাকা অর্থাৎ মাথাপিছু দিনে প্রায় ১৫০ টাকা বর্তমান সময়ে জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয় বলেই মনে হয়। ফলে ওই অর্থ কমানোর কোনও কারণ আদালত দেখেনি।
শেষ পর্যন্ত স্বামীর revision petition খারিজ করে পারিবারিক আদালতের ভরণপোষণের নির্দেশ বহাল রাখা হয়। আদেশটি ৩ আগস্ট ২০২৬-এর এবং মামলাটি ছিল Sathish v. Smt. Jyothi G.R. & Anr., RPFC No. 9 of 2026।
এই পর্যবেক্ষণের আসল গুরুত্ব কোথায়?
এই মামলাকে শুধুমাত্র “স্ত্রীকে বাড়ির কাজ করতে হবে কি না” এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে আদালতের বক্তব্যের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
আদালতের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে সম্মান, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমান দায়িত্ব এবং দাম্পত্য সম্পর্কে পারস্পরিক মর্যাদা।
একজন স্ত্রী যেমন সংসারের দায়িত্ব নিতে পারেন, তেমনই স্বামীরও সংসারের কাজে অংশ নেওয়া স্বাভাবিক। শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি ভালোবাসা বা যত্ন দেখানোও পারিবারিক সম্পর্কের অংশ হতে পারে। কিন্তু সেটিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আর স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নেওয়া এক বিষয় নয়।
এই কারণেই কর্ণাটক হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণটি দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এক কথায় আদালতের বার্তা
বিয়ে মানে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, একজনের উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া নয়।
শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা ভালোবাসা থেকে হতে পারে, জোর করে নয়।
আর নিজের বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাকে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অনুমতি নিতেই হবে, এমন কোনও ধারণাকে আদালত সমর্থন করেনি।
এই পর্যবেক্ষণই এখন সামাজিক মাধ্যমে এবং আইন মহলে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
