সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রাখি পূর্ণিমা ২০২৬: আজ, শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ভাই-বোনের ভালোবাসা, স্নেহ ও পারস্পরিক দায়িত্বের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব রক্ষাবন্ধন বা রাখি বন্ধন। এই দিনে বোনেরা ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে দেন এবং ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুখ ও মঙ্গল কামনা করেন। অন্যদিকে ভাইও বোনকে সুরক্ষা, ভালোবাসা ও পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে রাখি শুধু ভাই-বোনের একটি আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের উৎসব নয়। সময়ের সঙ্গে এই উৎসবের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়েছে। আজ অনেকেই রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যাঁদের ভাই বা বোনের মতো মনে করেন, তাঁদের হাতেও রাখি পরান।
Read More : সরকারি অফিসের চেয়ারে সাদা তোয়ালে কেন থাকে? জানুন আসল কারণ ও ইতিহাস
রাখি পূর্ণিমা কী?
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রক্ষাবন্ধন বা রাখি পূর্ণিমা পালিত হয়। ‘রক্ষা’ অর্থ সুরক্ষা এবং ‘বন্ধন’ অর্থ বন্ধন। অর্থাৎ রক্ষাবন্ধন বলতে এমন একটি বন্ধনকে বোঝায়, যার সঙ্গে ভালোবাসা, দায়িত্ব, বিশ্বাস ও একে অপরের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি জড়িয়ে রয়েছে।
সাধারণত এই দিনে বোন ভাইয়ের হাতে রাখি বাঁধেন। কপালে তিলক দিয়ে মিষ্টি খাওয়ান এবং ভাইয়ের মঙ্গল কামনা করেন। ভাইও বোনকে উপহার দেন এবং তাঁর পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
২০২৬ সালে কবে রাখি?
২০২৬ সালে রাখি পূর্ণিমা পালিত হচ্ছে ২৮ আগস্ট, শুক্রবার।
শ্রাবণ পূর্ণিমার এই দিনটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন রীতিতে পালিত হয়। কোথাও এটি রক্ষাবন্ধন, কোথাও নারলী পূর্ণিমা, আবার কোথাও ঝুলন পূর্ণিমা বা জন্মাষ্টমীর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবেও দেখা যায়।
কেন পালন করা হয় রাখি?
রাখির মূল বার্তা হল ভালোবাসা, সুরক্ষা, বিশ্বাস এবং পারিবারিক বন্ধন।
প্রচলিত রীতিতে বোন ভাইয়ের হাতে রাখি বেঁধে তাঁর ভালো থাকার প্রার্থনা করেন। ভাইও বোনকে জীবনের যেকোনও পরিস্থিতিতে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে আধুনিক সময়ে এই উৎসবের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়েছে। অনেক পরিবারে ভাই-বোন দুজনেই একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে দেন। এমনকি বন্ধু, দত্তক ভাই-বোন কিংবা সামাজিকভাবে ভাই-বোনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এমন মানুষদের মধ্যেও রাখি বিনিময়ের প্রচলন রয়েছে।
রাখির ইতিহাস কোথা থেকে?
রক্ষাবন্ধনের ইতিহাস নিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতিতে একাধিক কাহিনি ও লোকবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনিগুলির একটি হল শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর গল্প।
মহাভারত-সম্পর্কিত এই জনপ্রিয় কাহিনিটি আজও রাখির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর সেই গল্প
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একবার শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে আঘাত লেগে রক্ত বের হতে শুরু করে। তাঁর আঙুল থেকে রক্ত পড়তে দেখে আশপাশের সকলে কিছু দিয়ে ক্ষতটি বাঁধার চেষ্টা করছিলেন।
সেই সময় দ্রৌপদী নিজের শাড়ির একটি অংশ ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙুলে বেঁধে দেন। দ্রৌপদীর এই ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় কৃষ্ণ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তাঁকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীকালে মহাভারতের পাশাখেলার ঘটনায় দ্রৌপদী যখন কৌরব সভায় অপমানিত হচ্ছিলেন, তখন কৃষ্ণ তাঁর সম্মান রক্ষা করেছিলেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস।
এই কারণেই কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর এই সম্পর্ককে অনেক সময় রক্ষাবন্ধনের প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই গল্পটি মূলত জনপ্রিয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। বর্তমান রাখি উৎসবের সরাসরি ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে এটিকে একমাত্র প্রমাণিত উৎস বলা ঠিক নয়।
ইন্দ্র ও ইন্দ্রাণীর কাহিনিও রাখির সঙ্গে যুক্ত
রাখির ইতিহাস নিয়ে আরেকটি প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনি রয়েছে। পুরাণ ও লোকপরম্পরায় দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কাহিনিতে বলা হয়, দেবতা ও অসুরদের যুদ্ধে ইন্দ্র বিপদের মুখে পড়েছিলেন।
ইন্দ্রের স্ত্রী ইন্দ্রাণী তাঁর স্বামীর মঙ্গল ও বিজয়ের জন্য একটি পবিত্র সুতো বা রক্ষাসূত্র ব্যবহার করেছিলেন বলে কাহিনিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধরনের রক্ষাসূত্রের ধারণা থেকেই রক্ষাবন্ধনের সঙ্গে ‘রক্ষা’ বা সুরক্ষার ভাবনার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে সাংস্কৃতিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
রক্ষাবন্ধনের সঙ্গে রাজা বলি ও লক্ষ্মীর গল্প
আরেকটি বহুল প্রচলিত কাহিনি রয়েছে ভগবান বিষ্ণু, দেবী লক্ষ্মী এবং অসুররাজ বলিকে ঘিরে।
কাহিনি অনুযায়ী, রাজা বলির কাছে ভগবান বিষ্ণু বামন রূপে গিয়ে তিন পা জমি চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বিষ্ণু বলির রাজ্যে অবস্থান করেন। বিষ্ণুকে ফিরে পাওয়ার জন্য দেবী লক্ষ্মী রাজা বলির হাতে রাখি বাঁধেন এবং তাঁকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করেন।
বলি লক্ষ্মীর ইচ্ছাকে সম্মান করে বিষ্ণুকে তাঁর সঙ্গে ফিরে যেতে দেন। এই কাহিনিও রাখির মূল ভাবনা, অর্থাৎ রক্তের সম্পর্কের বাইরে ভালোবাসা ও রক্ষার সম্পর্ককে তুলে ধরে।
ইতিহাসে রাখির সামাজিক ভূমিকা
রাখি শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন সময়ে এটি সামাজিক ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখিবন্ধনের ভাবনাকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়। সেই সময় মানুষ একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বার্তা দিয়েছিলেন।
ফলে রাখির ধারণা শুধু ভাই-বোনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে আটকে না থেকে বৃহত্তর সামাজিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবেও জায়গা করে নেয়।
রাখির দিন কী কী করা হয়?
রাখির দিনে সাধারণত সকালে স্নান করে পুজো বা প্রার্থনার মাধ্যমে দিনের শুরু হয়। এরপর বোন ভাইয়ের কপালে তিলক দেন এবং তাঁর হাতে রাখি বাঁধেন। এরপর ভাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হয়। ভাইও বোনকে উপহার দেন। অনেক পরিবারে এই দিনে বিশেষ খাবার রান্না হয়। নতুন পোশাক পরা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়াও উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে অনলাইনে রাখি পাঠানোর ব্যবস্থাও জনপ্রিয় হয়েছে। দূরে থাকা ভাই-বোনেরা কুরিয়ার বা অনলাইন পরিষেবার মাধ্যমে একে অপরকে রাখি ও উপহার পাঠান।
শুধু ভাই নয়, বোনের প্রতিও দায়িত্ব
রাখির পুরনো ধারণায় ভাইয়ের দায়িত্ব ছিল বোনকে রক্ষা করা। কিন্তু বর্তমান সমাজে এই ধারণাটি অনেক বেশি পারস্পরিক। আজকের দিনে ভাই যেমন বোনের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন, তেমনই বোনও ভাইয়ের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। অর্থাৎ আধুনিক রক্ষাবন্ধনের মূল কথা হতে পারে:
“আমি তোমার পাশে আছি, তুমিও আমার পাশে থেকো।”
এই পারস্পরিকতার কারণেই সময়ের সঙ্গে রাখির জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একই পূর্ণিমার বিভিন্ন উৎসব
শ্রাবণ পূর্ণিমার দিন শুধু রাখিই পালিত হয় না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে একই পূর্ণিমা নানা আঞ্চলিক রীতি ও নামে পরিচিত।
নারলী পূর্ণিমা
মহারাষ্ট্র ও কিছু উপকূলীয় অঞ্চলে এই দিন নারলী পূর্ণিমা হিসেবে পালিত হয়। সমুদ্র ও নৌযাত্রার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে এই উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
ঝুলন পূর্ণিমা
পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার মতো অঞ্চলে রাধা-কৃষ্ণকে দোলনায় বসিয়ে ঝুলন উৎসব পালনের ঐতিহ্য রয়েছে। তাই এই সময়ের সঙ্গে ঝুলন পূর্ণিমার সম্পর্কও রয়েছে।
উপাকর্ম ও পবিত্র সুতো পরিবর্তন
ভারতের কিছু অঞ্চলে এই পূর্ণিমায় ব্রাহ্মণ ও বৈদিক পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মধ্যে উপাকর্ম বা পবিত্র সুতো পরিবর্তনের আচার পালন করা হয়।
অর্থাৎ একই পূর্ণিমা ভারতবর্ষের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে একসঙ্গে ধারণ করে।
রাখির আসল বার্তা কী?
রাখির সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, এটি শুধুমাত্র একটি সুতো নয়। হাতে বাঁধা একটি ছোট্ট রাখির মধ্যে থাকে শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, দায়িত্ব এবং একে অপরকে হারিয়ে না ফেলার প্রতিশ্রুতি। ভাই-বোন যত দূরেই থাকুন না কেন, বছরের এই একটি দিন তাঁদের পুরনো স্মৃতি, হাসি-ঠাট্টা এবং সম্পর্ককে আবার সামনে নিয়ে আসে। তাই রাখির গুরুত্ব শুধু রাখি বাঁধার মুহূর্তে নয়। এর আসল অর্থ হল সম্পর্ককে সম্মান করা এবং প্রয়োজনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো।
২০২৬-এর রাখিতে কী হোক প্রতিজ্ঞা?
এই রাখিতে শুধু উপহার নয়, সম্পর্কটাকেও একটু সময় দেওয়া যাক।
ভাই-বোন একে অপরের সঙ্গে কথা বলুন, পুরনো স্মৃতি মনে করুন, ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা দূর করুন এবং একে অপরকে মনে করিয়ে দিন যে জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও সম্পর্কের জায়গাটি একই রকম গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি রাখির সুতো ছিঁড়ে যেতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার বন্ধন যেন কখনও না ছিঁড়ে যায়।
শুভ রক্ষাবন্ধন ২০২৬
ভাই-বোনের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও অটুট সম্পর্কের উৎসব হোক এবারের রাখি।
শুভ রাখি পূর্ণিমা।
শুভ রক্ষাবন্ধন ২০২৬।

