সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে উচ্চশিক্ষা দফতরের ২০২৬-২৭ সালের বাজেট নিয়ে আলোচনার জবাব দিতে গিয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী শ্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের বর্তমান অবস্থা, শিক্ষার মান, পরিকাঠামোর অভাব, শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্রসংখ্যা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মতো একাধিক বিষয়।
মন্ত্রী দাবি করেন, নতুন সরকার এমন একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা হাতে পেয়েছে যা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল “পোকায় খাওয়া উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা”, যাকে পুনর্গঠন করাই এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
Read More : পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরির বয়সসীমায় বড় স্বস্তি, আরও ২ বছর বাড়ল Upper Age Limit-এর ছাড়
৩১টি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও অনেকগুলির অবস্থা উদ্বেগজনক
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী সরকার ৩১টি রাজ্যপোষিত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুললেও তার মধ্যে বেশ কয়েকটির পরিকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন,
- দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটিতে মাত্র ৩৯ জন ছাত্র রয়েছে।
- বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি আইটিআই ক্যাম্পাসে চলছে।
- সেখানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও যাতায়াতের ব্যবস্থাও নেই বলে দাবি করেন।
কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয় ও হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও মন্তব্য
মন্ত্রী দাবি করেন, কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী জমি ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। গেস্ট ফ্যাকাল্টিদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।
একইসঙ্গে তিনি জানান, হাওড়ার হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ১৭৮ জন ছাত্র রয়েছে এবং উপাচার্যও কর্মীসংকটের কথা জানিয়েছেন।
আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন
বক্তব্যে দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রানি রাসবালা গ্রীন ইউনিভার্সিটি, হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী।
তাঁর দাবি,
- কোথাও স্থায়ী ভবন নেই।
- কোথাও জমির সমস্যা রয়েছে।
- কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক বা অনুমোদিত পদ নেই।
- কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া বাড়িতে চলছে।
কলেজ ইউনিয়ন রুম নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, বিভিন্ন সরকারি কলেজের ইউনিয়ন রুম খোলার পর বহু আপত্তিকর সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষদের রিপোর্ট অনুযায়ী সেখানে পাওয়া গেছে:
- খালি মদের বোতল
- তরবারি
- কাটারি
- হুক্কা
- এমনকি একটি কলেজের ইউনিয়ন রুম থেকে ব্যবহৃত কন্ডোমও উদ্ধার হয়েছে বলে তিনি বিধানসভায় দাবি করেন।
জাতীয় গড়ের নিচে পশ্চিমবঙ্গের Gross Enrolment Ratio
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের Gross Enrolment Ratio (GER) জাতীয় গড়ের নিচে নেমে এসেছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী,
- জাতীয় গড় প্রায় ৩০ শতাংশ।
- পশ্চিমবঙ্গের GER প্রায় ২৬ শতাংশ।
তিনি এটিকে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
অস্থায়ী শিক্ষকদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর ইঙ্গিত
বিধানসভায় তিনি জানান, ইউজিসি-নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন অস্থায়ী শিক্ষকদের সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া কলেজে শিক্ষকতা করার সুযোগ ভবিষ্যতে দেওয়া হবে না।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর কড়া নজর
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জানান, বেসরকারি B.Ed, Law, Pharmacy, Polytechnic ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে AICTE, NCTE-সহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মান বজায় রাখতে পারবে না, তাদের অ্যাফিলিয়েশন বাতিল করারও ইঙ্গিত দেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে Edu City গড়ার পরিকল্পনা
মন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত পাঁচটি Edu City-র মধ্যে একটি পশ্চিমবঙ্গে আনার চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার।
এজন্য মুখ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, নীতি আয়োগ এবং কেন্দ্রের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেও পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিদেশে পড়তে যাওয়া মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন স্কলারশিপ
মন্ত্রী ঘোষণা করেন, বিশ্বের সেরা ১০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে যাওয়া মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্বামী বিবেকানন্দের নামে নতুন স্কলারশিপ চালু করা হবে।
এছাড়াও ছাত্রীদের জন্য ৫০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা এককালীন না দিয়ে ধাপে ধাপে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান, যাতে তারা পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে উৎসাহিত হয়।
স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড ও NAAC র্যাঙ্কিং নিয়ে মন্তব্য
মন্ত্রী জানান, প্রায় আড়াই লক্ষ আবেদনের মধ্যে ১ লক্ষ ১০ হাজার শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড পেয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজ্যের আরও বেশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে NAAC স্বীকৃতি এবং NIRF র্যাঙ্কিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য, আগামী দিনে দেশের প্রথম ১০০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানকে স্থান করে দেওয়া।
কেন্দ্রীয় প্রকল্পে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জানান, অতীতে উচ্চশিক্ষা দফতরের বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্য অংশ নেয়নি। তবে বর্তমানে PM-USHA, SAMARTH, Vidya Lakshmi এবং One Nation One Subscription-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্য সরকার যোগ দিয়েছে এবং ধাপে ধাপে আরও প্রকল্পে অংশ নেওয়া হবে।
বিধানসভায় উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দুই-ই উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার মান উন্নয়ন, কেন্দ্রীয় প্রকল্পে অংশগ্রহণ এবং জাতীয় মানদণ্ডে পশ্চিমবঙ্গকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রূপরেখাও তিনি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, বিরোধীরা এই বক্তব্যের জবাবে কী অবস্থান নেয়, সেটিও আগামী দিনে রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
