সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের জন্য বড় ঘোষণা রাজ্য সরকারের। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো, চাষের খরচ কমানো এবং কৃষিকাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে Farm Mechanization Scheme 2026-27-এর আওতায় একাধিক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী দুধ কুমার মণ্ডল সম্প্রতি এই প্রকল্প নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে Farm Mechanization-এর জন্য প্রায় ৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত কৃষককে যন্ত্র কেনায় সহায়তা করা নয়, পাশাপাশি গ্রামে কৃষিযন্ত্র ভাড়া দেওয়ার কেন্দ্র, Farm Machinery Bank এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির পরিকাঠামো তৈরি করা।
Read More : পশ্চিমবঙ্গে ৫ মাসে ২,৪৫৪ ধর্ষণ, ৬০০ খুন: RTI তথ্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বড় প্রশ্ন
৮০ শতাংশ ভর্তুকি আসলে কোথায়?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। প্রতিটি কৃষক ব্যক্তিগতভাবে ট্রাক্টর কিনলেই ৮০ শতাংশ ভর্তুকি পাবেন, এমন নয়।
পশ্চিমবঙ্গের Farm Mechanization Scheme-এ বিভিন্ন ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি Farm Mechanization পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, Farm Machinery Bank/Farm Machinery Hub তৈরির ক্ষেত্রে প্রকল্পমূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা, সর্বোচ্চ ২৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণ কৃষক নিজের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কৃষিযন্ত্র কিনলে যন্ত্রের ধরন অনুযায়ী সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা, সর্বোচ্চ ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
৪০৭ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় পরিকল্পনা
২০২৬-২৭ সালে এই প্রকল্পে প্রায় ৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রায় ৬৭,৫৮৫ জন কৃষককে বিভিন্নভাবে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও রাজ্যে—
- ৫০০টি Custom Hiring Centre তৈরির পরিকল্পনা
- ১,০৮৫টি Farm Machinery Bank/Hub তৈরির লক্ষ্য
- ১০০টি আধুনিক কৃষি ড্রোন দেওয়ার পরিকল্পনা
- ৫০০টি Solar Pump Set স্থাপনের উদ্যোগ
নেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
এর ফলে শুধু কৃষকরা যন্ত্র কেনার সুবিধা পাবেন না, গ্রামীণ এলাকায় কৃষিযন্ত্র ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে নতুন আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
ট্রাক্টর কিনে ভাড়ায় দেওয়ার সুযোগ
এই প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল কৃষিযন্ত্রকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ।
কৃষক নিজের পছন্দ অনুযায়ী অনুমোদিত সংস্থার কাছ থেকে ট্রাক্টর বা অন্যান্য কৃষিযন্ত্র কিনতে পারেন। সেই যন্ত্র নিজের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অন্য কৃষককে ভাড়ায় দিয়ে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে Custom Hiring Centre-এর ক্ষেত্রে নিয়ম আরও নির্দিষ্ট। শুধু একটি ট্রাক্টর কিনে ভাড়া দেওয়ার জন্য এই প্রকল্প নেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট তালিকা থেকে একাধিক ধরনের কৃষিযন্ত্র রাখতে হয়।
Custom Hiring Centre কী?
অনেক ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, থ্রেশার বা হারভেস্টার কেনা সম্ভব হয় না। তাঁদের জন্য কৃষিযন্ত্র ভাড়ায় পাওয়ার ব্যবস্থা আরও কার্যকর।
এই উদ্দেশ্যেই Custom Hiring Centre বা CHC তৈরি করা হচ্ছে। কৃষক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, থ্রেশার, স্প্রেয়ারসহ বিভিন্ন যন্ত্র ভাড়ায় নিতে পারবেন।
সরকারি Farm Mechanization তথ্য অনুযায়ী, CHC তৈরির ক্ষেত্রে প্রকল্পমূল্যের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক-লিঙ্কড ভর্তুকি পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
কী কী কৃষিযন্ত্রের জন্য সুবিধা মিলতে পারে?
প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে একাধিক ধরনের কৃষিযন্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেমন:
- ট্রাক্টর
- পাওয়ার টিলার
- পাওয়ার উইডার
- পাওয়ার রিপার
- রোটাভেটর
- পাওয়ার স্প্রেয়ার
- থ্রেশার
- রাইস ট্রান্সপ্লান্টার
- সোলার পাম্প
- কৃষি ড্রোন
- মাল্টি-ক্রপ থ্রেশার
- মিনি রাইস মিল
- ডাল মিল
- অয়েল মিল
- বীজ প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্র
তবে কোন যন্ত্রে কত শতাংশ ভর্তুকি এবং সর্বোচ্চ কত টাকা পাওয়া যাবে, তা যন্ত্রের ধরন ও প্রকল্পের নির্দিষ্ট component-এর উপর নির্ভর করবে।
ছোট কৃষিযন্ত্রেও রয়েছে আর্থিক সহায়তা
ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ছোট কৃষিযন্ত্র কেনার ক্ষেত্রেও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, One Time Assistance to Small and Marginal Farmers for Purchase of Small Farm Implements বা OTA-SFI-এর আওতায় নির্দিষ্ট ছোট কৃষিযন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
২০২৬-২৭ সালের ঘোষণার ভিত্তিতে সাধারণভাবে সুবিধা পাওয়ার জন্য কৃষকবন্ধু (New) অথবা PM-Kisan Samman Nidhi-তে নথিভুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে জানানো হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৭০ বছর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মীরা এই সুবিধার জন্য যোগ্য নন।
তবে component অনুযায়ী অতিরিক্ত শর্ত থাকতে পারে। যেমন, কিছু কৃষিযন্ত্রের ক্ষেত্রে নিজের নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষিজমির নথি বা Record of Rights বা ROR-এর প্রয়োজন হতে পারে।
লটারির মাধ্যমে নির্বাচন
একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হলে সুবিধাভোগী নির্বাচনে কম্পিউটারাইজড লটারি ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পুরো প্রক্রিয়া ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে করার কথাও প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ আবেদন করলেই নিশ্চিতভাবে ভর্তুকি পাওয়া যাবে না। আবেদন যাচাই এবং নির্ধারিত নির্বাচন প্রক্রিয়ার পর সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে।
ভর্তুকির টাকা কীভাবে পাওয়া যাবে?
সরকারি Farm Mechanization Scheme-এর তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্র কেনার পর নির্দিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে Direct Benefit Transfer বা DBT-এর মাধ্যমে সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। যন্ত্রের geo-tagging-ও প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
তাই শুধু যন্ত্র কেনার পরিকল্পনা করলেই হবে না। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট component-এর নিয়ম, অনুমোদিত যন্ত্রের তালিকা, manufacturer/dealer-এর শর্ত এবং নিজের যোগ্যতা ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
অনলাইন আবেদন কোথায়?
পশ্চিমবঙ্গের Farm Mechanization-এর সরকারি পোর্টালে ২০২৬-২৭ সালের জন্য Guidelines, Activity Calendar এবং অন্যান্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি পোর্টালে ৬ আগস্ট ২০২৬-এ ২০২৬-২৭ সালের Farm Mechanization Scheme-এর Guidelines এবং ৩১ আগস্ট ২০২৬-এ Activity Calendar প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
Farm Mechanization Portal: wbfms.wb.gov.in
কৃষকদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?
পশ্চিমবঙ্গে কৃষিকাজে শ্রমের খরচ এবং সময় দুটোই বড় বিষয়। আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করলে জমি তৈরি, বীজ বপন, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, ধান কাটা, মাড়াই এবং ফসল সংগ্রহের মতো কাজে সময় ও শ্রম দুটোই কমানো সম্ভব।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, Farm Mechanization উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ৬.০২ লক্ষের বেশি কৃষিযন্ত্র বিতরণ হয়েছে এবং ৫.৫৬ লক্ষের বেশি কৃষক উপকৃত হয়েছেন। পাশাপাশি ২,৫৯৮টি Custom Hiring Centre তৈরি হয়েছে।
ফলে ২০২৬-২৭ সালের নতুন বরাদ্দকে শুধুমাত্র একটি ভর্তুকি প্রকল্প হিসেবে না দেখে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিকে আরও যন্ত্রনির্ভর করার একটি বড় উদ্যোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
শেষ কথা
কৃষিযন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি সহায়তার খবরটি নিঃসন্দেহে কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ৮০ শতাংশ সুবিধাটি কোন component-এর জন্য এবং ব্যক্তিগত কৃষক, Farm Machinery Bank বা Custom Hiring Centre-এর ক্ষেত্রে কী নিয়ম প্রযোজ্য, তা আলাদা করে বোঝা জরুরি।
ব্যক্তিগত কৃষিযন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে সাধারণত ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা এবং Farm Machinery Bank/Hub-এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ, সর্বোচ্চ ২৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
তাই আবেদন করার আগে সরকারি নির্দেশিকা দেখে নিজের যোগ্যতা ও যে যন্ত্রটি কিনতে চান তার জন্য প্রযোজ্য ভর্তুকির হার যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Agriculture Department, Farm Mechanization Portal এবং ২০২৬-২৭ সালের প্রকাশিত নির্দেশিকা ও সাম্প্রতিক সরকারি-বিষয়ক রিপোর্ট।
