সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে রাজ্য পুলিশের State Crime Records Bureau (SCRB)-এর RTI-র মাধ্যমে দেওয়া তথ্য। নথিতে ২০২৬ সালের মে মাস থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গুরুতর অপরাধের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, তা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
RTI-র জবাবটি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে State Crime Records Bureau-এর State Public Information Officer-এর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট RTI আবেদনের ভিত্তিতে চাওয়া তথ্য Annexure হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে।
পাঁচ মাসের পরিসংখ্যান কী বলছে?
RTI-র সঙ্গে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মে ২০২৬ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত রাজ্যে চারটি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে মোট রেকর্ড হওয়া মামলার সংখ্যা হল:
- ধর্ষণ: ২,৪৫৪টি মামলা
- খুন: ৬০০টি মামলা
- খুনের চেষ্টা: ১৩,১১৪টি মামলা
- গুরুতর জখম করার উদ্দেশ্যে হামলা: ৩২,৩৪১টি মামলা
অর্থাৎ, এই চারটি অপরাধের ক্ষেত্রেই মোট ৪৮,৫০৯টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে RTI-র তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। এগুলি নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা, আদালতে প্রমাণিত অপরাধ বা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সংখ্যা নয়। তাই এই পরিসংখ্যানকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি সূচক হিসেবে দেখা যায়, তবে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সংখ্যা হিসেবে নয়।
মাসভিত্তিক হিসাবেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা
নথিতে মাসভিত্তিক যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে:
| মাস | খুন | খুনের চেষ্টা | ধর্ষণ | গুরুতর জখম করার উদ্দেশ্যে হামলা |
|---|---|---|---|---|
| মে ২০২৬ | ১২৫ | ২,৯৪৭ | ৩৪৯ | ৭,৭৯৪ |
| জুন ২০২৬ | ১৩৪ | ৩,০৯৬ | ৩৮৯ | ৬,৯২২ |
| জুলাই ২০২৬ | ১৩৩ | ২,৫৬২ | ৭৮৬ | ৬,১৯১ |
| আগস্ট ২০২৬ | ১১১ | ২,৪৯৮ | ৪৫৯ | ৬,৩৩৪ |
| সেপ্টেম্বর ২০২৬* | ৯৭ | ২,০১১ | ৪৭১ | ৫,১০০ |
* সেপ্টেম্বরের তথ্য ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত।
এই হিসাব যোগ করলে RTI-তে উল্লেখ করা মোট সংখ্যাগুলির সঙ্গেই মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ ৬০০টি খুন, ১৩,১১৪টি খুনের চেষ্টা, ২,৪৫৪টি ধর্ষণ এবং ৩২,৩৪১টি গুরুতর জখমের মামলা মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শুধু একটি সংখ্যা নয়, পুরো ছবিটাই দেখতে হবে
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিচার করতে শুধুমাত্র একটি বা দুটি ঘটনার দিকে তাকালে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা এবং গুরুতর হামলার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে কয়েক মাসে হাজার হাজার মামলা নথিভুক্ত হওয়া অবশ্যই প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে খুনের চেষ্টার ১৩,১১৪টি মামলা এবং গুরুতর জখম করার উদ্দেশ্যে হামলার ৩২,৩৪১টি মামলা সংখ্যার দিক থেকে অত্যন্ত বড়। একই সঙ্গে ২,৪৫৪টি ধর্ষণের মামলা এবং ৬০০টি খুনের ঘটনাও উদ্বেগের কারণ হিসেবে সামনে আসে।
তবে এই সংখ্যাগুলির সঙ্গে আগের সময়ের একই ধরনের পরিসংখ্যানের তুলনা করলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে। অর্থাৎ অপরাধ বেড়েছে না কমেছে, তা বোঝার জন্য আগের বছর বা আগের সরকারের একই সময়ের সঙ্গে তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন।
রাজনৈতিক অভিযোগের প্রসঙ্গও উঠছে
এই RTI তথ্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যে অভিযোগ করা হচ্ছে যে, সরকারের পরিবর্তনের পর বহু তৃণমূল কর্মী-সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে এবং কোথাও কোথাও হুমকি বা রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগও উঠেছে।
তবে গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা বা রাজনৈতিক হুমকির মতো অভিযোগের কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যা এই RTI নথিতে দেওয়া নেই। ফলে এই দাবিগুলিকে এই নথির অপরাধের পরিসংখ্যানের সঙ্গে সরাসরি যোগ করার আগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ রেকর্ড, আদালতের নথি এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখা দরকার:
প্রথমত, রাজ্যে কতগুলি গুরুতর অপরাধের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কারণে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা কতগুলি মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুই ধরনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলে রাজ্যের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া সম্ভব।
পাঁচ মাসের তথ্য কি পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট?
এক অর্থে, হ্যাঁ, এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে চারটি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৮ হাজার মামলা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য প্রশাসনের জন্য উপেক্ষা করার মতো নয়।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, শুধুমাত্র পাঁচ মাসের তথ্য দিয়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
প্রয়োজন হবে আরও কিছু তথ্যের:
- ২০২৫ সালের একই সময়ের অপরাধের পরিসংখ্যান
- ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য
- জেলা অনুযায়ী অপরাধের হিসাব
- FIR, গ্রেপ্তার ও চার্জশিটের সংখ্যা
- আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার
- রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক মামলার আলাদা পরিসংখ্যান
- গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার প্রকৃতি
- আদালতে জামিন ও মামলা খারিজের তথ্য
এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে অপরাধের প্রকৃত প্রবণতা কী এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা।
তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে
RTI-তে পাওয়া এই পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে তথ্যের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, এই বিপুল সংখ্যক গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশি তদন্ত, চার্জশিট এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি কতটা হচ্ছে?
কারণ শুধু মামলা নথিভুক্ত হওয়া নয়, অপরাধের তদন্ত, দ্রুত চার্জশিট, বিচার এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ২,৪৫৪টি ধর্ষণ, ৬০০টি খুন, ১৩,১১৪টি খুনের চেষ্টা এবং ৩২,৩৪১টি গুরুতর হামলার মামলা শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্কের উপাদান হিসেবে না দেখে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভিত্তিক সূচক হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সংখ্যাগুলির সঙ্গে আগের বছরের একই সময়ের তথ্য এবং রাজনৈতিক মামলা-গ্রেপ্তারের যাচাই করা তথ্য পাশাপাশি রাখা। তাহলেই বোঝা যাবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র।

