সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
Gig and Delivery Workers Social Security: খাবার ডেলিভারি, অনলাইন শপিংয়ের পার্সেল পৌঁছে দেওয়া কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহণ, এই কাজগুলির সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ কর্মীর জীবনে সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন রাস্তায় নেমে কাজ করলেও দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের অনেককেই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। এবার সেই পরিস্থিতি বদলানোর লক্ষ্যে গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের শ্রমবিধি সংক্রান্ত প্রস্তাবে গিগ কর্মীদের পরিচয় নথিভুক্ত করা, নির্দিষ্ট শর্তে সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করার বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, একটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বছরে অন্তত ৯০ দিন অথবা একাধিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মোট ১২০ দিন কাজ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।
Gig and Delivery Workers Social Security: গিগ কর্মীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?
বর্তমানে খাবার ডেলিভারি, কুইক কমার্স, ই-কমার্স এবং অ্যাপভিত্তিক পরিবহণ পরিষেবায় বহু মানুষ কাজ করেন। তাঁদের কাজের ধরন প্রচলিত স্থায়ী চাকরির থেকে আলাদা। অনেকেই নিজের সুবিধামতো সময় বেছে নিয়ে কাজ করেন এবং একাধিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
কিন্তু কাজের এই নমনীয়তার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু সমস্যা। রাস্তায় দুর্ঘটনা, চিকিৎসার খরচ, নিয়মিত আয়ের অনিশ্চয়তা এবং কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।
এই পরিস্থিতিতে গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সরকারি ব্যবস্থার আওতায় নথিভুক্ত করা এবং তাঁদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
বছরে ৯০ দিন কাজ করলেই কি সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা মিলবে?
প্রস্তাবিত নিয়মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কাজের দিনের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ।
- একটি প্ল্যাটফর্মে কাজ করলে: আগের অর্থবর্ষে অন্তত ৯০ দিন কাজ করার শর্ত রয়েছে।
- একাধিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করলে: বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে অন্তত ১২০ দিনের কাজের শর্ত রয়েছে।
- চূড়ান্ত যোগ্যতা: নির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হতে পারে।
অর্থাৎ, শুধুমাত্র ৯০ দিন কাজ করলেই সব ধরনের সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে, এমন নয়। কোন প্রকল্পের আওতায় কী সুবিধা দেওয়া হবে এবং তার জন্য অতিরিক্ত কী শর্ত থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি পরিচয়পত্র ও ইউনিভার্সাল অ্যাকাউন্ট নম্বর
গিগ কর্মীদের নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা এই উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। সরকারি পোর্টালে নিবন্ধনের মাধ্যমে কর্মীদের পরিচয় সংরক্ষণ এবং তাঁদের জন্য ইউনিভার্সাল অ্যাকাউন্ট নম্বর বা UAN তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এর ফলে কর্মীর পরিচয় ও কাজের রেকর্ড সংরক্ষণ করা সহজ হতে পারে। একাধিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
ডিজিটাল পরিচয়পত্র এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত তথ্য ভবিষ্যতে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সংগঠিত করতে পারে।
Gig and Delivery Workers Social Security: ডেলিভারি সংস্থাগুলির দায়িত্বও বাড়বে
গিগ কর্মীদের নথিভুক্ত করা এবং তাঁদের কাজের তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাগ্রিগেটর বা প্ল্যাটফর্ম সংস্থাগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় কর্মীদের তথ্য সরকারি পোর্টালে জমা দেওয়া, নতুন কর্মীদের নথিভুক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য আপডেট করার মতো দায়িত্বের কথা রয়েছে।
এর ফলে কর্মীদের কাজের তথ্য সংরক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে বাস্তবে এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নিয়মের বাস্তবায়ন এবং সংস্থাগুলির নিয়ম মেনে চলার উপর।
গিগ কর্মীদের জন্য তৈরি হতে পারে সামাজিক সুরক্ষা তহবিল
গিগ কর্মীদের কল্যাণে সামাজিক সুরক্ষা তহবিলের ব্যবস্থা এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম সংস্থাগুলির কাছ থেকে নির্ধারিত নিয়মে আর্থিক অবদান সংগ্রহ করে কর্মীদের কল্যাণমূলক প্রকল্পে ব্যবহার করার বিধান সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোয় রয়েছে।
এই ধরনের তহবিলের মাধ্যমে দুর্ঘটনা বিমা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, জীবন বিমা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং বার্ধক্যকালীন সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিতে সহায়তার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কোন সুবিধা বাস্তবে পাওয়া যাবে, তার পরিমাণ কত হবে এবং কারা সেই সুবিধা পাবেন, তা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের চূড়ান্ত বিধি ও শর্তের উপর নির্ভর করবে।
গিগ কর্মীদের কল্যাণে জাতীয় পর্যায়ের বোর্ডের ভূমিকা
গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সমস্যাগুলি চিহ্নিত করা এবং তাঁদের কল্যাণে উপযুক্ত প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মীদের প্রয়োজন, কাজের পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি পর্যালোচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে এই ক্ষেত্রের কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কাজের পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের আর্থিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: ১ নভেম্বর থেকে Truecaller ছাড়াই জানা যাবে কে ফোন করছেন | নতুন CNAP পরিষেবা চালু করছে সরকার
Gig and Delivery Workers Social Security: সংসদে গিগ কর্মীদের অধিকার নিয়ে সরব হওয়ার দাবি
ডেলিভারি কর্মীদের অধিকার নিয়ে প্রকাশিত বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট সাংসদ দাবি করেছেন, সংসদে তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি কর্মীদের নিজেদের আন্দোলন ও সম্মিলিত দাবিও এই উদ্যোগের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গিগ কর্মীদের শুধুমাত্র অ্যাপভিত্তিক পরিষেবার অংশ হিসেবে না দেখে তাঁদের শ্রম ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। ব্যবসা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পক্ষে থেকেও কর্মীদের শোষণের বিরোধিতা করা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।
তবে শ্রমবিধির প্রস্তাব বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে কর্মীদের কাছে সুবিধা পৌঁছনো, সংস্থাগুলির দায়বদ্ধতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থার উপর।
কর্মীদের জন্য কী কী সুবিধার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে?
প্রস্তাবিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সুবিধার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
১. সরকারি ব্যবস্থায় কর্মীদের পরিচয় নথিভুক্তকরণ।
২. নির্দিষ্ট শর্তে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আসার সুযোগ।
৩. দুর্ঘটনা ও জীবন বিমার মতো সুরক্ষা প্রকল্পের সম্ভাবনা।
৪. স্বাস্থ্য এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার জন্য প্রকল্প তৈরির সুযোগ।
৫. বার্ধক্যকালীন আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা।
৬. প্ল্যাটফর্ম সংস্থাগুলির তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এই সমস্ত সুবিধা একই সঙ্গে প্রত্যেক কর্মীর জন্য নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে, এমন নয়। প্রকল্পভেদে যোগ্যতা এবং বাস্তবায়নের নিয়ম আলাদা হতে পারে।
ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে গিগ কর্মীদের অবদান ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শহরের রাস্তায় খাবার পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে অনলাইন কেনাকাটার পণ্য বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই কর্মীদের শ্রমের প্রয়োজন হয়।
তাই তাঁদের কাজের স্বীকৃতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু কর্মীদের স্বার্থেই নয়, শ্রমবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমবিধি এবং সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে কর্মীদের প্রকৃত উপকার নিশ্চিত করতে হলে নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ, সহজ নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং প্রতিশ্রুত সুবিধার বাস্তব প্রাপ্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
