করোনাকালের টেলিমেডিসিন প্রকল্পে বড় অনিয়মের অভিযোগ, ৬৪ সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কোটি টাকার সরঞ্জাম উধাও! FIR-এর নির্দেশ, দায়িত্বপ্রাপ্তদের বেতন কাটার সিদ্ধান্ত

সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

WhatsApp Group
Join Now

করোনাকালের টেলিমেডিসিন প্রকল্পে: পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় করোনাকালে চালু হওয়া টেলিমেডিসিন প্রকল্পের সরঞ্জাম নিয়ে বড়সড় অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের অন্তত ৬৪টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কয়েক কোটি টাকার চিকিৎসা ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের হদিশ মিলছে না। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় FIR করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন। পাশাপাশি, যে আধিকারিক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে ওই সরঞ্জামগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল, তাঁদের কাছ থেকে সরঞ্জামের অর্থ পুনরুদ্ধারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

করোনার সময় চালু হয়েছিল ‘স্বাস্থ্য ইঙ্গিত’

COVID-19 মহামারির সময় রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিষেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ‘স্বাস্থ্য ইঙ্গিত’ প্রকল্প।

এই ব্যবস্থায় গ্রামীণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকে মেডিক্যাল কলেজ ও বড় সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত করে দূরবর্তী স্থান থেকেই রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

Google
Add West Bengal Times যুক্ত করুন গুগল-এ পছন্দের উৎস হিসেবে
Add Preference

Read More : বি.এড.-এর পর এবার ডি-ফার্ম কলেজগুলিতেও কড়া পদক্ষেপ, একের পর এক শোকজ নোটিশ

এই প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কম্পিউটার, মনিটর, UPS, ইন্টারনেট সংযোগসহ একাধিক প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়।

রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বাজেট নথিতেও টেলিমেডিসিন পরিষেবার বিস্তারের কথা উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত রাজ্যে ৭.১১ কোটিরও বেশি টেলিমেডিসিন পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে সরকারি বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোথায় গেল সেই সরঞ্জাম?

স্বাস্থ্য দফতরের পরিদর্শন ও রিপোর্টে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরঞ্জামের ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে বলে ABP Ananda-র প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

কোথাও কম্পিউটার বা মনিটর নেই, কোথাও UPS রয়েছে কিন্তু তার ব্যাটারি বা MCB নেই। আবার কোনও কোনও জায়গায় সরঞ্জামের একটি অংশ রয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ সেট নেই। ফলে প্রকল্পের জন্য কেনা সরঞ্জামগুলির একটি বড় অংশ বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই বা তার কোনও সন্ধান মিলছে না।

স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ধরনের ঘটনা রাজ্যের একাধিক জেলা ও স্বাস্থ্য জেলায় সামনে এসেছে। এর মধ্যে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, হাওড়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান এবং বসিরহাট স্বাস্থ্য জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নাম উঠে এসেছে।

FIR করার নির্দেশ স্বাস্থ্য ভবনের

ঘটনাটি সামনে আসার পর রাজ্যের সব জেলার Chief Medical Officer of Health বা CMOH-দের স্থানীয় থানায় FIR করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অর্থাৎ বিষয়টিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক গাফিলতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সরঞ্জাম কোথায় গেল, কীভাবে সরকারি সম্পত্তির হিসাব থেকে সেগুলি উধাও হল এবং এর জন্য কে বা কারা দায়ী, তা খতিয়ে দেখতে আইনি তদন্তের পথও খোলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের Anti-Corruption Branch-ও সরকারি কর্মচারী ও সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা রাখে।

দায়িত্বে থাকা কর্মীদের বেতন থেকে টাকা কাটার নির্দেশ

ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, শুধু FIR নয়, সরঞ্জামের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আর্থিক দায়ও নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরঞ্জামের দায়িত্ব ছিল Medical Officer-এর, কোথাও BMOH-এর, আবার কোথাও Community Health Officer বা নার্সদের উপর। যে জায়গায় যে কর্মী বা আধিকারিকের কাছে সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল, সেখান থেকে সরঞ্জামের মূল্য পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তাঁদের বেতন থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

তবে কার বিরুদ্ধে কত টাকা কাটা হবে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীরা আত্মপক্ষ সমর্থনের কী সুযোগ পাবেন, তা পৃথক প্রশাসনিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ার বিষয়।

কেন্দ্রীয় অনুদানের অর্থে কেনা হয়েছিল সরঞ্জাম

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অর্থের উৎস। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনাকালীন স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় অনুদানের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল।

২০২১ সালে পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের আওতায় স্বাস্থ্য খাতে দেশের জন্য ৮,৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮২৯ কোটি টাকা

ফলে সরকারি অর্থে কেনা সরঞ্জাম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় শুধু সম্পত্তি সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়, সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা?

টেলিমেডিসিনের মতো পরিষেবার মূল উদ্দেশ্য হল প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে বড় হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে টেলিমেডিসিন পরিষেবার বিস্তার করেছে। সরকারি বাজেট নথি অনুযায়ী, রাজ্যের শত শত প্রাথমিক ও আরবান প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে টেলিমেডিসিন পরিষেবার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কম্পিউটার, UPS বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকলে শুধু সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয় না, প্রত্যন্ত এলাকার রোগীর পরিষেবাও ব্যাহত হতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

এখন মূল নজর থাকবে তিনটি বিষয়ে।

প্রথমত, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে FIR-এর পর পুলিশি তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে।

দ্বিতীয়ত, সরঞ্জামগুলির প্রকৃত হিসাব, ক্রয়মূল্য, সরবরাহের নথি এবং স্টক রেজিস্টারের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির কতটা মিল রয়েছে।

তৃতীয়ত, কোন আধিকারিক বা কর্মীর কাছে কোন সরঞ্জামের দায়িত্ব ছিল এবং সরঞ্জাম নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের ভিত্তি কী হবে।

সরকারি সম্পত্তি হারানোর ঘটনা এবং তার জন্য আর্থিক দায় চাপানোর বিষয়টি তাই প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও এগোতে পারে।

সব মিলিয়ে, করোনাকালে গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী করার জন্য যে টেলিমেডিসিন পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তার একটি অংশ থেকে কোটি টাকার সরঞ্জাম নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ এখন রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে, সরঞ্জামগুলি কীভাবে নিখোঁজ হল এবং এর জন্য প্রকৃতপক্ষে কার দায় রয়েছে।

Syed Mosharaf Hossain
Syed Mosharaf Hossainhttps://syedmosharafhossain.in/
Syed Mosharaf Hossain is a visionary educator, technical innovator, and the Principal of Purbasthali-II Government ITI, West Bengal. An Electronics & Communication Engineer, he is the creator of the internationally recognized "Arduino-based Smart Shoe" for women’s safety, featured in the World Book of Records. As the Founder of SD ONUPRON GROUP, Syed has over six years of expertise in SEO, web development, and digital journalism. Honored as the "Principal of the Year" at the Asia Education Conclave 2025, he remains dedicated to driving technical innovation and mentoring future professionals in India's education sector.

Read more

Local News