সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বেনিয়ম, অব্যবস্থা এবং তথাকথিত ‘ডিগ্রি বিক্রির’ অভিযোগ ঘিরে বড়সড় পদক্ষেপের পথে রাজ্য শিক্ষা দফতর। রাজ্যের ৬০২টি বিএড কলেজে বিশেষ পরিদর্শন ও মূল্যায়নের পর উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর মধ্যে ৫৩টি কলেজের নির্দিষ্ট ঠিকানায় কোনও প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। আরও ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
শুধু তাই নয়, ১০০ নম্বরের মূল্যায়নে ৩০-এর নিচে নম্বর পেয়েছে ১১৪টি কলেজ। সব মিলিয়ে ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালানোর অনুপযুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী। ইতিমধ্যেই প্রায় ৪৫০ থেকে ৪৭৫টি বিএড কলেজকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কলেজগুলিকে ত্রুটি সংশোধন ও জবাব দেওয়ার জন্য ২১ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
Read More : পশ্চিমবঙ্গ ৭ম পে কমিশন ২০২৬: অনলাইনে Memorandum ও Suggestions জমা শুরু, শেষ তারিখ ৩১ অক্টোবর
কীভাবে সামনে এল বিএড কলেজগুলির এই চিত্র?
উচ্চশিক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সরকার দফতরভিত্তিক পর্যালোচনা শুরু করে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন পেশাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়।
এর মধ্যেই একটি প্রতিবেশী রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবের কাছে একটি চিঠি আসে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পেশাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পড়াশোনা ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় বিএডের পাশাপাশি ল, পলিটেকনিক, আইটিআই, বি-ফার্ম এবং ডি-ফার্মের মতো পেশাগত শিক্ষার কথাও উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, ভিনরাজ্যের বহু পড়ুয়া নিয়মিত ক্লাস না করেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে শুধুমাত্র পরীক্ষার সময় উপস্থিত থেকে ডিগ্রি সংগ্রহ করছেন।
এই অভিযোগের পরেই প্রথম পর্যায়ে বিএড কলেজগুলিকে কেন্দ্র করে বিশেষ পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
Read More : CKYC Card Download 2026: কীভাবে CKYC Card পাবেন, Password কী, SMS না এলে কী করবেন?
৬০২টি বিএড কলেজে বিশেষ পরিদর্শন
জুলাই ও আগস্ট মাসজুড়ে রাজ্যের ৬০২টি সরকারি ও বেসরকারি বিএড কলেজে বিশেষ পরিদর্শন চালানো হয় বলে জানানো হয়েছে।
পরিদর্শনের জন্য ১০০ নম্বরের একটি মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়:
- কলেজের পরিকাঠামো
- পাঠদান ও শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া
- শিক্ষার গুণগত মান
এই মূল্যায়নে ৬০২টি কলেজের সামগ্রিক গড় নম্বর দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১.৫ শতাংশ।
তবে গড় নম্বরের থেকেও বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে পরিদর্শনের সময় পাওয়া কয়েকটি নির্দিষ্ট তথ্য।
৫৩টি কলেজের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি
পরিদর্শকদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৩টি বিএড কলেজের নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে কলেজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কোথাও প্রতিষ্ঠান তালাবন্ধ অবস্থায় ছিল, আবার কোথাও নির্দিষ্ট ঠিকানায় কোনও কলেজই ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে।
একটি অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এই প্রতিষ্ঠানগুলির অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলি কীভাবে চলছিল, তা নিয়েও তদন্তের প্রশ্ন উঠছে।
একই জায়গায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের ‘সাইনবোর্ড’?
আরও ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
মন্ত্রী যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তাতে অভিযোগ করা হয়েছে, কোথাও একই ক্যাম্পাসে সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে কখনও বিএড কলেজ, কখনও পলিটেকনিক, কখনও আইটিআই বা ফার্মেসি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাড়ির ড্রয়িং রুমের ঠিকানা ব্যবহার করে বিএড কলেজের অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এই ধরনের ঘটনা সত্যি হলে তা শুধু পরিকাঠামোগত দুর্বলতা নয়, বরং অনুমোদন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলবে।
১১৪টি কলেজ ৩০ নম্বরের নিচে
পরিদর্শনের সময় নির্ধারিত ১০০ নম্বরের মূল্যায়নে ১১৪টি কলেজ ৩০-এরও কম নম্বর পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামো, পাঠদান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এর সঙ্গে ৫৩টি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান এবং ১৭টি গুরুতর অনিয়মের প্রতিষ্ঠানকে মিলিয়ে মোট ২৬৫টি কলেজকে কার্যত চলার অনুপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এর বাইরেও আরও ১২১টি কলেজের পরিকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল বলে প্রাথমিক পরিদর্শনে ধরা পড়েছে। অর্থাৎ, ৬০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে খুব বড় একটি অংশই কোনও না কোনও সমস্যার মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রায় ১৫১টি কলেজে সন্তোষজনক ছবি
তবে সব কলেজের পরিস্থিতি খারাপ নয়। প্রায় ১৫১টি কলেজ সন্তোষজনক পরিকাঠামো ও শিক্ষাদানের ব্যবস্থা দেখাতে পেরেছে বলে জানানো হয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলির অনেকেই ৬৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত নম্বর পেয়েছে।
পরিদর্শনে কিছু প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস, অনুমোদিত শিক্ষক, পড়ুয়াদের উপস্থিতি এবং ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের মতো বিষয়ের প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমেও ক্লাস ও উপস্থিতির বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে।
বছরে প্রায় ৬২ হাজার বিএড ডিগ্রি
বিএড শিক্ষা ব্যবস্থার পরিসরও যথেষ্ট বড়। উচ্চশিক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর প্রায় ৬২ হাজার বিএড ডিগ্রি তৈরি হচ্ছে। এখানেই উঠছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থী তৈরি হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় তার প্রতিফলন কতটা দেখা যাচ্ছে?
মন্ত্রী আরও দাবি করেছেন, শুধু পশ্চিমবঙ্গের পড়ুয়ারাই নন, গোয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকেও বহু পড়ুয়া পশ্চিমবঙ্গে বিএড করতে আসছেন।
ভিনরাজ্যের পড়ুয়াদের নিয়েও প্রশ্ন
মন্ত্রী বিশেষভাবে গোয়া ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে আসা পড়ুয়াদের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু পড়ুয়া নিয়মিত ক্লাস না করেই শুধুমাত্র পরীক্ষার সময় উপস্থিত হয়ে ডিগ্রি নিয়ে চলে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলা মাধ্যমে পরিচালিত কোনও প্রতিষ্ঠানে এমন পড়ুয়াদের নিয়মিত পাঠদান ও প্রশিক্ষণ বাস্তবে কীভাবে হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই ‘ডিগ্রি বিক্রির চক্র’ নিয়ে অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
৪৫০ থেকে ৪৭৫টি কলেজকে শোকজ
পরিদর্শনের রিপোর্ট হাতে আসার পর আর অপেক্ষা করতে চাইছে না শিক্ষা দফতর। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই প্রায় ৪৫০ থেকে ৪৭৫টি বিএড কলেজকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তবে সরাসরি অনুমোদন বাতিল না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি মেনে কলেজগুলিকে নিজেদের বক্তব্য জানানোর এবং প্রয়োজনীয় ত্রুটি সংশোধনের জন্য ২১ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এই ২১ দিনের হিসাব শুরু হবে কলেজ কর্তৃপক্ষ নোটিশ হাতে পাওয়ার দিন থেকে।
জবাব সন্তোষজনক না হলে কী হবে?
২১ দিনের মধ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষকে তাদের পরিকাঠামো এবং অন্যান্য ঘাটতি সম্পর্কে জবাব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশোধনমূলক পদক্ষেপও নিতে হবে।
যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব সন্তোষজনক না হয় অথবা সংশ্লিষ্ট ত্রুটি সংশোধন না করা হয়, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে De-affiliation বা অনুমোদন বাতিল করা হতে পারে। পাশাপাশি চলতি শিক্ষাবর্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ভর্তি স্থগিত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু নোটিশ দিয়েই বিষয়টি শেষ হচ্ছে না। কলেজের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
আগে যারা ডিগ্রি নিয়েছেন, তাঁদের কী হবে?
সাংবাদিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, অস্তিত্বহীন বা অনিয়মে চলা কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে অতীতে পড়াশোনা করে যারা ইতিমধ্যেই ডিগ্রি পেয়েছেন বা চাকরি করছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী?
এর উত্তরে মন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা রেট্রোস্পেক্টিভ অর্থাৎ অতীত থেকে কার্যকর হবে না; বরং প্রসপেক্টিভ বা ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর হবে।
অর্থাৎ, কোনও কলেজের অনুমোদন যে সময়ে বাতিল হবে, তার পরে ওই কলেজ থেকে নতুন করে ডিগ্রি নেওয়ার বিষয়টি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে তিনি জানান।
এই বক্তব্যের ফলে পুরনো ডিগ্রিধারীদের নিয়ে তৈরি হওয়া আশঙ্কার ক্ষেত্রে আপাতত একটি স্পষ্ট অবস্থান সামনে এসেছে।
১৫ বছরের দুর্নীতির খতিয়ান নিয়ে আসছে শ্বেতপত্র
বিএড কলেজের পরিদর্শনের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বৃহত্তর চিত্র নিয়েও বড় ঘোষণা করেছেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, গত ১৫ বছরে উচ্চশিক্ষা দফতরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অনিয়মের যে সমস্ত তথ্য সামনে এসেছে, তার পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান নিয়ে একটি ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করা হবে।
এই শ্বেতপত্রে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরের বিভিন্ন অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্বেতপত্রটি খুব শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে এবং তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কমিশনের কাছেও তা তুলে দেওয়া হবে।
বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু কমিশনের কাছেও যাবে রিপোর্ট
শুধু প্রকাশ্যেই তথ্য দেওয়া নয়, উচ্চশিক্ষা দফতরের হাতে থাকা তথ্যপ্রমাণ ও তদন্তের ফলাফল বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু কমিশনের কাছেও জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠিত এই কমিশনের কাছে বিএড কলেজ সংক্রান্ত পরিদর্শন রিপোর্ট এবং পরবর্তী শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে বিএড কলেজের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি বিষয়টি বৃহত্তর দুর্নীতি তদন্তের ক্ষেত্রেও যেতে পারে।
ভর্তি ফি নিয়ে বড় প্রশ্ন
বেসরকারি বিএড কলেজগুলিতে ভর্তি হতে পড়ুয়াদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগও সাংবাদিকদের প্রশ্নে উঠে আসে। কোথাও প্রায় ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত ভর্তি ফি নেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গ সামনে আসে। এই প্রসঙ্গে মন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, যদি কোনও প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনই বাতিল করে দেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।
অর্থাৎ, শুধু আর্থিক জরিমানা নয়, অনুমোদন বাতিল এবং ভর্তি বন্ধ করাকেই এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় প্রশাসনিক অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ১৫ বছরে কীভাবে বাড়ল এই প্রতিষ্ঠানগুলি?
মন্ত্রী দাবি করেছেন, গত প্রায় ১৫ বছরে রাজ্যে ‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ একাধিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য পেশাগত শিক্ষাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যেখানে শিক্ষার পরিবর্তে ডিগ্রি পাওয়াই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
এখন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে, এই অভিযোগগুলির প্রতিটির যথাযথ তদন্ত করে বাস্তব পরিস্থিতি নির্ধারণ করা এবং একই সঙ্গে বৈধ ও মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলিকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা।
ভালো কলেজগুলিকেও মান উন্নয়নের নির্দেশ
শুধু দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নয়, তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করা কলেজগুলিকেও নিজেদের ছোটখাটো ঘাটতি দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব কলেজ ৬৫ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পেয়েছে, তাদেরও যেখানে পরিকাঠামো বা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে, তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। এর ফলে সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপের লক্ষ্য শুধু ‘খারাপ কলেজ’ বন্ধ করা নয়, সামগ্রিকভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান বাড়ানো বলেই দাবি করা হচ্ছে।
এখন নজর ২১ দিনের সময়সীমার দিকে
৬০২টি কলেজের পরিদর্শনের পর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার জন্য নিঃসন্দেহে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে শোকজের পরবর্তী প্রক্রিয়াটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোন কলেজ সন্তোষজনক জবাব দিতে পারে, কারা ত্রুটি সংশোধন করে, আর কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত De-affiliation বা ভর্তি স্থগিতের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
একইসঙ্গে বহু পড়ুয়ার ভবিষ্যৎও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি বৈধভাবে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ কথা
পশ্চিমবঙ্গের বিএড কলেজগুলিতে পরিদর্শনের পর উঠে আসা তথ্য সত্যিই উদ্বেগজনক। ৬০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৩টির অস্তিত্ব না পাওয়া, ১৭টির বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, ১১৪টির ৩০-এর নিচে নম্বর এবং মোট ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে অনুপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তুলেছে।
এখন সরকারের সামনে দুটি বড় পরীক্ষা। প্রথমত, অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত নিষ্পত্তি করা। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া যাতে কোনও প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে শুধুমাত্র ডিগ্রি দেওয়ার কেন্দ্র হয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
২১ দিনের শোকজ প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য De-affiliation এবং আগামী দিনে প্রকাশিত হতে চলা শ্বেতপত্র এই পুরো বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যোগ্যতাহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত ছাত্রছাত্রী ও ভালো কলেজগুলির স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকে, এখন সেদিকেই নজর শিক্ষা মহলের।
