সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
Unclaimed Assets Portal: ভারতে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সম্পদ বছরের পর বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। অনেক সময় পরিবারের কেউ মারা গেলে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিমার দাবি, শেয়ার, ডিভিডেন্ড বা মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগের কথা উত্তরাধিকারীরা জানতেই পারেন না। আবার বহু মানুষ চাকরি, বাসস্থান বা যোগাযোগের ঠিকানা বদলানোর কারণে নিজেদেরই কিছু আর্থিক সম্পদের হদিস হারিয়ে ফেলেন।
এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অধীন ডিপার্টমেন্ট অফ ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (DFS) ২০২৬ সালের ২৯ মে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চালু করা হয়েছে একটি নতুন একক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পড়ে থাকা অব্যবহৃত বা দাবি না করা অর্থের সন্ধান করতে পারবেন।
কী এই নতুন পোর্টাল Unclaimed Assets Portal?
কেন্দ্র সরকারের চালু করা নতুন পোর্টালটির নাম Unclaimed Financial Assets Portal।
পোর্টালের ঠিকানা: www.unclaimedassetsportal.in
এই পোর্টালটি একটি “Common Landing Portal” হিসেবে কাজ করবে। অর্থাৎ, আগে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সম্পদের খোঁজ পেতে আলাদা আলাদা ওয়েবসাইটে যেতে হতো, কিন্তু এখন একটি জায়গা থেকেই বিভিন্ন উৎসে অনুসন্ধান করা যাবে।
কোন কোন সম্পদের খোঁজ পাওয়া যাবে?
নতুন পোর্টালের মাধ্যমে নাগরিকরা নিম্নলিখিত আর্থিক সম্পদের সন্ধান করতে পারবেন:
- ব্যাংকের অব্যবহৃত আমানত (Unclaimed Bank Deposits)
- বিমা সংক্রান্ত অদাবিকৃত দাবি (Unclaimed Insurance Claims)
- শেয়ার (Shares)
- ডিভিডেন্ড (Unclaimed Dividends)
- মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগ (Mutual Funds)
- অন্যান্য আর্থিক সম্পদ
অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোনো অর্থ পড়ে থাকলে তা খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে।
কেন এত টাকা অব্যবহৃত থেকে যায়?
ভারতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন কারণে অদাবিকৃত অবস্থায় থেকে যায়।
প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- অ্যাকাউন্টধারীর মৃত্যু
- নমিনি না থাকা
- ঠিকানা পরিবর্তন
- মোবাইল নম্বর পরিবর্তন
- পুরনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভুলে যাওয়া
- দীর্ঘদিন শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডের তথ্য আপডেট না করা
- পরিবারকে বিনিয়োগের তথ্য না জানানো
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় একাধিক ব্যাংক, বিমা কোম্পানি বা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখেছেন। মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা সেই সম্পদের তথ্যই জানেন না। ফলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ বছরের পর বছর পড়ে থাকে।
সরকারের ‘আপকি পুঁজি, আপকা অধিকার’ অভিযান
এই নতুন পোর্টালটি কেন্দ্র সরকারের “आपकी पूँजी, आपका अधिकार (আপনার টাকা, আপনার অধিকার)” প্রচারের অংশ।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য:
- মানুষের হারিয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়া অর্থের সন্ধান দেওয়া
- উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া
- আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা
- আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানো
ব্যাংক, আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করবে পোর্টাল?
পোর্টালে প্রবেশ করার পর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধান ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবেন।
পোর্টালটি নিজে অর্থ প্রদান করবে না। বরং এটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেসে পৌঁছানোর জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করবে।
ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি হবে:
- পোর্টালে প্রবেশ করুন।
- প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান বিভাগ নির্বাচন করুন।
- নাম, PAN, জন্মতারিখ, অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্য বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিন।
- সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধান ফলাফল দেখুন।
- কোনো অদাবিকৃত সম্পদ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী দাবি জানান।
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন?
প্রবীণ নাগরিক
অনেক প্রবীণ ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যাংক বা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে অর্থ রেখেছেন। দীর্ঘদিন পরে সেই তথ্য মনে না থাকলে এই পোর্টাল সহায়ক হতে পারে।
মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী
পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে তাঁর নামে থাকা আর্থিক সম্পদের তথ্য খুঁজে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। নতুন পোর্টালটি সেই কাজ সহজ করবে।
চাকরিজীবী ও প্রবাসী ভারতীয়
চাকরির কারণে বিভিন্ন রাজ্যে স্থানান্তরিত হওয়া ব্যক্তিরা পুরনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বিনিয়োগ ভুলে যেতে পারেন। তাঁদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগকারী
যাঁদের দীর্ঘদিনের পুরনো শেয়ার, ডিভিডেন্ড বা মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে, তাঁরা সহজেই নিজেদের সম্পদের তথ্য যাচাই করতে পারবেন।
ভারতের আর্থিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি ওয়েবসাইট নয়, বরং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক এবং নাগরিকবান্ধব করার একটি বড় পদক্ষেপ।
এর ফলে:
- অদাবিকৃত সম্পদের পরিমাণ কমবে
- আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে
- উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা কমবে
- ডিজিটাল গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী হবে
- সাধারণ মানুষের আর্থিক অধিকার রক্ষা হবে
কী কী সতর্কতা মেনে চলবেন?
এই পোর্টাল ব্যবহারের সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি:
- শুধুমাত্র সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন।
- OTP বা ব্যাংক পাসওয়ার্ড কাউকে শেয়ার করবেন না।
- কোনো এজেন্টকে টাকা দিয়ে অনুসন্ধান করানোর প্রয়োজন নেই।
- সন্দেহজনক ফোন বা ইমেলের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।
- দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভালোভাবে পড়ে নিন।
ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আনতে পারে এই উদ্যোগ?
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে সরকার নাগরিকদের আর্থিক অধিকার সুরক্ষিত করতে একের পর এক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই একক পোর্টাল ভবিষ্যতে দেশের কোটি কোটি মানুষের হারিয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়া সম্পদ খুঁজে পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
একসময় কোনো ব্যক্তির পুরনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিমার টাকা বা শেয়ারের খোঁজ করতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হতো। এখন একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম সেই প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।
উপসংহার
অনেক ভারতীয় নাগরিকের অজান্তেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিমা দাবি, শেয়ার, ডিভিডেন্ড বা মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা পড়ে থাকতে পারে। কেন্দ্র সরকারের নতুন Unclaimed Financial Assets Portal সেই হারিয়ে যাওয়া অর্থ খুঁজে পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।
আপনার বা আপনার পরিবারের কারও নামে কোনো অদাবিকৃত আর্থিক সম্পদ রয়েছে কিনা, তা একবার যাচাই করে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ সরকারের নতুন উদ্যোগের মূল বার্তাই হলো:
“আপনার টাকা, আপনার অধিকার”।
