সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ভারতে কি আসছে প্লাস্টিকের নোট?: ভারতে কি এবার কাগজের নোটের বদলে প্লাস্টিকের নোট চালু হতে চলেছে? সম্প্রতি এই প্রশ্নটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই ভাবছেন, যদি প্লাস্টিকের নোট আসে তাহলে কি বর্তমান ১০, ২০, ৫০, ১০০ বা ৫০০ টাকার কাগজের নোট বাতিল হয়ে যাবে? আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এর ফলে কি নতুন করে নোটবন্দির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে?
আসলে বিষয়টি তেমন নয়। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) বর্তমানে পলিমার বা প্লাস্টিক-ভিত্তিক ব্যাঙ্কনোট চালুর সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান কাগজের নোট হঠাৎ করেই অচল হয়ে যাবে।
কেন আবার প্লাস্টিকের নোট নিয়ে ভাবছে RBI?
RBI প্রথমবার এই পরিকল্পনা করছে না। এক দশকেরও বেশি সময় আগে পরীক্ষামূলকভাবে প্লাস্টিকের নোট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি শহরে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু নোট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত কিছু সমস্যার কারণে সেই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
এবার RBI নতুন করে বিষয়টি বিবেচনা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক বোর্ড বৈঠকেও এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই একটি নতুন পাইলট প্রকল্প শুরু হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
অনুপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্রে কী কী তথ্য লাগবে? আবেদন করার আগে জেনে নিন সম্পূর্ণ তালিকা
প্লাস্টিকের নোট আসলে কী?
প্লাস্টিকের নোট বলতে আমরা যেটা বুঝি, তা আসলে পলিমার সাবস্ট্রেট দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের মুদ্রা। এটি ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মতো শক্ত প্লাস্টিক নয়।
এই নোট:
- হালকা ও নমনীয়
- সহজে ভাঁজ করা যায়
- সাধারণ কাগজের নোটের মতো ব্যবহার করা যায়
- পানি, ধুলো ও আর্দ্রতা প্রতিরোধী
- ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম
RBI কেন প্লাস্টিকের নোট চালু করতে চায়?
১. দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার
বর্তমান কাগজের নোট, বিশেষ করে ১০ ও ২০ টাকার নোট, খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের হাতে হাত বদল হওয়ায় এগুলো দ্রুত ছিঁড়ে যায় ও ময়লা হয়ে যায়।
অন্যদিকে প্লাস্টিকের নোট অনেক বেশি টেকসই। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব।
২. জাল নোট রোধ
পলিমার নোটে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়।
যেমন:
- স্বচ্ছ উইন্ডো
- মাইক্রো-অপটিক হোলোগ্রাম
- বিশেষ নিরাপত্তা কালি
- উন্নত সিকিউরিটি থ্রেড
এসব কারণে জাল নোট তৈরি করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
৩. ছাপানোর খরচ কমবে
প্রথমদিকে প্লাস্টিকের নোট তৈরি করতে বেশি খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদে খরচ কমে যায়।
কারণ একই নোট বহু বছর ব্যবহার করা সম্ভব হয় এবং বারবার নতুন নোট ছাপাতে হয় না।
কাগজের নোট ছাপাতে কত খরচ হচ্ছে?
RBI-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে নোট ছাপানোর খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ₹৬,৩৭২.৮ কোটি।
আগের অর্থবর্ষে এই খরচ ছিল ₹৫,১০১.৪ কোটি।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নোট ছাপানোর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কত নোট বাতিল করতে হচ্ছে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত ও ময়লা নোট বাজার থেকে তুলে নিতে হচ্ছে।
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে প্রায় ২৩.৮ বিলিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত নোট বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে:
- সবচেয়ে বেশি ছিল ₹৫০০ টাকার নোট
- দ্বিতীয় স্থানে ছিল ₹১০০ টাকার নোট
এতে RBI-এর পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়লেও নগদের চাহিদা কমছে না
UPI, মোবাইল ব্যাঙ্কিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট দ্রুত জনপ্রিয় হলেও ভারতে নগদ টাকার ব্যবহার এখনও অত্যন্ত বেশি।
২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশে প্রচলিত মুদ্রার পরিমাণ প্রায় ₹৪২.৮৬ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা একটি রেকর্ড।
এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় অর্থনীতিতে এখনও নগদের গুরুত্ব অনেক বেশি।
কোন নোট দিয়ে শুরু হতে পারে পরীক্ষামূলক প্রকল্প?
খবর অনুযায়ী, RBI প্রথমে ১০ ও ২০ টাকার নোট দিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করতে পারে।
কারণ এই নোটগুলোই সবচেয়ে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে।
বিশ্বের কোন কোন দেশে প্লাস্টিকের নোট রয়েছে?
ভারত এই ক্ষেত্রে প্রথম দেশ নয়।
বর্তমানে ৬০টিরও বেশি দেশ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে পলিমার নোট ব্যবহার করছে।
এর মধ্যে রয়েছে:
- অস্ট্রেলিয়া
- কানাডা
- যুক্তরাজ্য
- সিঙ্গাপুর
- মালয়েশিয়া
- থাইল্যান্ড
- ইন্দোনেশিয়া
- নিউজিল্যান্ড
- ভিয়েতনাম
- রোমানিয়া
অস্ট্রেলিয়া ১৯৮৮ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিমার নোট চালু করে।
বর্তমান কাগজের নোটের কী হবে?
এটাই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে RBI কোথাও বলেনি যে কাগজের নোট হঠাৎ করে বাতিল করা হবে।
বরং যদি প্লাস্টিকের নোট চালু হয়, তাহলে ধীরে ধীরে পুরনো কাগজের নোট বাজার থেকে তুলে নেওয়া হবে।
অর্থাৎ:
- আপনার কাছে থাকা নোট বৈধ থাকবে
- ব্যাংকে বদলানোর জন্য আলাদা করে ছুটতে হবে না
- কোনও নোটবন্দি হবে না
- নতুন নোট আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো নোট ধীরে ধীরে কমে যাবে
সামনে কী হতে পারে?
RBI খুব শীঘ্রই একটি পাইলট প্রকল্প চালু করতে পারে। সেই প্রকল্পের ফলাফল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ATM-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের নোট সারা দেশে চালু হবে কি না।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে ভারতের মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হবে।
প্লাস্টিকের নোট নিয়ে RBI-এর নতুন ভাবনা মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে— বেশি নিরাপত্তা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার এবং কম খরচ। নোট ছাপানোর ব্যয় বাড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত নোটের সংখ্যা বাড়ছে এবং নগদের চাহিদাও এখনও শক্তিশালী। এই পরিস্থিতিতে পলিমার নোট RBI-এর জন্য একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
তবে আপাতত সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। বর্তমান কাগজের নোট বাতিল হচ্ছে না। RBI-এর পাইলট প্রকল্পের ফলাফলই ঠিক করবে ভবিষ্যতে ভারত কত দ্রুত প্লাস্টিকের নোটের দিকে এগোবে।
