সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
PM SETU Scheme 2026: আজ সকালেই ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম। হঠাৎই চোখে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের সিউড়ি বিধায়ক এবং রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের একটি পোস্ট। সেখানে তিনি কয়েকটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “পিএম-সেতু প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ যোগদানের পর প্রথম কর্মশালা।”
পোস্টটি দেখার পর আমার মাথায় সঙ্গে সঙ্গেই একটি প্রশ্ন আসে। পিএম সেতু প্রকল্প আবার কী? কেন এই কর্মশালা এত গুরুত্বপূর্ণ? যদি আমি নিজেই এই প্রকল্প সম্পর্কে না জেনে থাকি, তাহলে আমার মতো আরও অনেকেই হয়তো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন।
সেই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় খোঁজখবর। সরকারি নথি, স্কিল ইন্ডিয়া পোর্টাল এবং বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে যা জানা গেল, তা শুধু ITI শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ দক্ষ কর্মশক্তি গড়ার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত জানব PM SETU Scheme 2026 কী, কেন চালু হয়েছে, কারা সুবিধা পাবেন এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য এর গুরুত্ব কতটা।
PM SETU Scheme Official Portal : PM SETU Official Portal
PM SETU Scheme 2026 কী?
PM SETU-এর পূর্ণরূপ হলো Pradhan Mantri Skilling and Employability Transformation through Upgraded ITIs।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এমন একটি জাতীয় প্রকল্প যার লক্ষ্য দেশের সরকারি ITI-গুলিকে আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
বর্তমানে শিল্পক্ষেত্রে যে ধরনের দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ITI থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের দক্ষতার সঙ্গে তার মিল থাকে না। এই ‘স্কিল গ্যাপ’ দূর করাই PM SETU প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কেন এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে?
ভারতে বর্তমানে প্রায় ১৫,০০০-এরও বেশি ITI রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রে প্রযুক্তি বদলেছে, মেশিন বদলেছে এবং কাজের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে।
ফলে অনেক ITI-তে এখনও পুরনো সিলেবাস ও যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়েন।
PM SETU প্রকল্পের মাধ্যমে:
- শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে
- আধুনিক প্রযুক্তি শেখানো হবে
- কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হবে
- দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হবে
- ‘Viksit Bharat 2047’ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করা হবে
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য
PM SETU প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
- সরকারি ITI-গুলিকে আধুনিক স্কিলিং সেন্টারে রূপান্তর করা
- শিল্প-নেতৃত্বাধীন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা
- যুবকদের কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা প্রদান
- ITI স্নাতকদের চাকরিযোগ্যতা বৃদ্ধি
- পাঁচটি National Skill Training Institute (NSTI)-কে উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা
১,০০০ সরকারি ITI-র বড়সড় রূপান্তর
এই প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ১,০০০টি সরকারি ITI-কে উন্নত করা হবে।
এর মধ্যে থাকবে:
- ২০০টি Hub ITI
- ৮০০টি Spoke ITI
Hub and Spoke Model কী?
একটি উন্নত ও আধুনিক ITI-কে Hub হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
সেই Hub-এর সঙ্গে একাধিক Spoke ITI যুক্ত থাকবে।
Hub ITI-তে থাকবে:
- অত্যাধুনিক ল্যাব
- উন্নত মেশিনারি
- ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা
- প্লেসমেন্ট সাপোর্ট
- ইনোভেশন সেন্টার
অন্যদিকে Spoke ITI-গুলি Hub-এর সুবিধা ব্যবহার করে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেবে।
কী কী নতুন সুবিধা আসছে?
PM SETU প্রকল্পের মাধ্যমে ITI-গুলিতে চালু হতে পারে:
- AI ও Automation সম্পর্কিত কোর্স
- Advanced Manufacturing
- Robotics
- Electric Vehicle Technology
- Renewable Energy
- Industry 4.0 Skills
- Smart Maintenance Systems
এছাড়া বর্তমান ট্রেডগুলিকেও আধুনিক শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্গঠন করা হবে।
শিক্ষার্থীরা কী কী সুবিধা পাবেন?
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা পাবেন:
উন্নত প্রশিক্ষণ
নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ।
চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি
শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
Apprenticeship সুবিধা
শিক্ষাকালেই শিল্প প্রতিষ্ঠানে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ।
Career Counselling
ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও কর্মসংস্থান সহায়তা।
Life Skills Training
যোগাযোগ দক্ষতা, টিমওয়ার্ক এবং পেশাগত আচরণ সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ।
শিল্প সংস্থাগুলির ভূমিকা কেন বাড়ানো হচ্ছে?
PM SETU প্রকল্পের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো শিল্পক্ষেত্রের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।
সরকারের লক্ষ্য হলো প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা।
শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো:
- কোর্স ডিজাইনে অংশ নেবে
- প্রশিক্ষণ মান নির্ধারণ করবে
- ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ দেবে
- দক্ষ কর্মী নিয়োগে সহায়তা করবে
ফলে প্রশিক্ষণ শেষ করার পর চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
পাঁচটি NSTI-কে উৎকর্ষ কেন্দ্র করা হবে
দেশের পাঁচটি National Skill Training Institute-কে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এই কেন্দ্রগুলি অবস্থিত:
- ভুবনেশ্বর
- চেন্নাই
- হায়দরাবাদ
- লুধিয়ানা
- কানপুর
এগুলি ভবিষ্যতে প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত দক্ষতা বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রকল্পের বাজেট কত?
PM SETU প্রকল্পের মোট আর্থিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা।
এই অর্থ ব্যয় হবে আগামী পাঁচ বছরে।
অর্থায়নের উৎস:
- কেন্দ্র সরকার
- রাজ্য সরকার
- শিল্প অংশীদার
- আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন ADB ও World Bank
পশ্চিমবঙ্গের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পশ্চিমবঙ্গে বহু সরকারি ITI রয়েছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
পিএম সেতু প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের যোগদান এবং প্রথম কর্মশালার আয়োজন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাজ্যও এই আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চলেছে।
যদি এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে রাজ্যের ITI শিক্ষার্থীরা আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ, উন্নত অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ পেতে পারেন।
- PM SETU Scheme Official Portal : PM SETU Official Portal
- Skill India Digital Portal : Skill India Digital
- Directorate General of Training (DGT) :Directorate General of Training (DGT)
- Ministry of Skill Development & Entrepreneurship (MSDE): MSDE Official Website
- Craftsmen Training Scheme (CTS) / ITI Information: CTS & ITI Information
উপসংহার
পিএম সেতু প্রকল্প শুধুমাত্র একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প নয়। এটি ভারতের ITI ব্যবস্থাকে নতুন যুগের উপযোগী করে তোলার একটি বৃহৎ উদ্যোগ।
ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখার মাধ্যমে যে প্রশ্নটি আমার মনে এসেছিল, তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম এটি আসলে দেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি গঠনের একটি বড় পদক্ষেপ।
আগামী দিনে এই প্রকল্প কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে যে দূরত্ব এতদিন ছিল, PM SETU সেই দূরত্ব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠতে পারে।
