মহররম ও কারবালার পূর্ণ ইতিহাস: ইসলামী নববর্ষ থেকে আশুরা, ১–১১ মহররমের দিনভিত্তিক ঘটনাপ্রবাহ, ইয়াজিদের পরিণতি এবং কারবালার চিরন্তন শিক্ষা

সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

WhatsApp Group
Join Now

Muharram and Karbala History: ইসলামী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস মহররম। অনেকের কাছেই এটি শুধু নতুন হিজরি বছরের সূচনা, আবার অনেকের কাছে এটি শোক, আত্মত্যাগ, ধৈর্য ও সত্যের পক্ষে অটল থাকার এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর ১০ মহররম বা আশুরা এলেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিম স্মরণ করেন কারবালার সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাকে, যেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর অল্পসংখ্যক সঙ্গী সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

কিন্তু কারবালার যুদ্ধ হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক পটভূমি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নৈতিক আদর্শের প্রশ্ন এবং একের পর এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই নিবন্ধে আমরা জানব মহররমের ইতিহাস, ইসলামী নববর্ষের সূচনা, কারবালার যুদ্ধ কেন হয়েছিল, ১ থেকে ১১ মহররম পর্যন্ত প্রতিদিন কী ঘটেছিল, ইয়াজিদের শেষ পরিণতি কী ছিল এবং কারবালার এই ঘটনা আজও কেন মানবতার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

পর্ব ১ Muharram and Karbala History: মহররমের ইতিহাস, ইসলামী নববর্ষ, ইয়াজিদের উত্থান, কারবালার পটভূমি।

মহররম কী? কেন কারবালার যুদ্ধ হয়েছিল? ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনার পেছনের প্রকৃত ইতিহাস

প্রতি বছর ইসলামী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস মহররম এলেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিমের হৃদয়ে এক বিশেষ অনুভূতির জন্ম হয়। কারও কাছে এটি ইসলামী নববর্ষের সূচনা, কারও কাছে এটি ইবাদতের মাস, আবার কারও কাছে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ের স্মৃতি।

বিশেষ করে ১০ মহররম, যা আশুরা নামে পরিচিত, ইসলামের ইতিহাসে এমন এক দিন, যেদিন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীরা কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো…

  • মহররম কেন ইসলামের প্রথম মাস?
  • কারবালার যুদ্ধের সূচনা কীভাবে?
  • কেন রাসুল (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) যুদ্ধ করতে বাধ্য হলেন?
  • ইয়াজিদ কে ছিলেন?
  • আদৌ কি এটি ক্ষমতার লড়াই ছিল, নাকি ন্যায়-অন্যায়ের সংঘর্ষ?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় ১,৪০০ বছর আগের ইসলামের ইতিহাসে।

মহররম কী?

মহররম আরবি শব্দ। অর্থ সম্মানিত, পবিত্র বা নিষিদ্ধ

আল্লাহ তাআলা কুরআনে মোট ১২টি মাসের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে চারটি মাসকে বলা হয়েছে পবিত্র মাস।

এই চারটি হলো—

  • মহররম
  • রজব
  • জিলকদ
  • জিলহজ

প্রাচীন আরব সমাজেও এই মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রাখা হতো।

কেন মহররমই ইসলামী বছরের প্রথম মাস?

অনেকেই মনে করেন, রাসুল (সা.)-এর জন্মদিন থেকেই ইসলামী বছর শুরু হয়েছে। আসলে তা নয়। খলিফা হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে (৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে) প্রশাসনিক কাজ সহজ করার জন্য প্রথমবারের মতো ইসলামী হিজরি সনের সূচনা করা হয়। বছর গণনার সূচনা ধরা হয় হিজরত থেকে, অর্থাৎ রাসুল (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় গমনকে কেন্দ্র করে।

তবে প্রথম মাস হিসেবে নির্বাচিত হয় মহররম, কারণ—

  • এটি আরবি বছরের সূচনা মাস।
  • জিলহজে হজ সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন বছরের শুরু হয়।
  • সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন।

আশুরা কী?

“আশুরা” শব্দটি এসেছে আরবি আশারা থেকে, যার অর্থ দশ। অর্থাৎ মহররমের ১০ তারিখ হলো আশুরা। আশুরা শুধু কারবালার কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

ইসলামী ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে—

  • আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফিরআউনের হাত থেকে মুক্তি দেন।
  • ফিরআউন লোহিত সাগরে ডুবে যায়।
  • হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা নিরাপদে ভিড়েছিল বলেও কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে।

এই কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখতেন এবং মুসলমানদেরও রোজা রাখার উৎসাহ দিতেন।

তাহলে কারবালার ঘটনার সঙ্গে আশুরার সম্পর্ক কী?

কারবালার যুদ্ধ আশুরার দিন সংঘটিত হওয়ায় ১০ মহররম মুসলিম ইতিহাসে আরও গভীর তাৎপর্য লাভ করে। এই দিনে রাসুল (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন।

কারবালার যুদ্ধের পেছনের ইতিহাস

এই ইতিহাস শুরু হয় রাসুল (সা.)-এর ওফাতের বহু বছর পরে। ক্রমে ইসলামের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। পরবর্তীতে উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান দীর্ঘদিন খিলাফত পরিচালনা করেন। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ক্ষমতায় বসেন। এখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়।

ইয়াজিদ কে ছিলেন?

ইয়াজিদ ছিলেন উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়ার ছেলে। তিনি ক্ষমতায় বসার পর ইসলামের বিশিষ্ট সাহাবি ও রাসুল (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) দাবি করেন। অনেকেই রাজনৈতিক কারণে বিষয়টি মেনে নিলেও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন—

  • ইমাম হুসাইন (রা.)
  • আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)

কেন ইমাম হুসাইন (রা.) বায়আত দিলেন না?

ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম হুসাইন (রা.) মনে করতেন—

শাসকের প্রথম শর্ত হলো ন্যায়বিচার, সত্যবাদিতা ও ইসলামী আদর্শ অনুসরণ। তাঁর দৃষ্টিতে ইয়াজিদের শাসনব্যবস্থা সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত ছিল। তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতার জন্য নয়, নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। এ কারণেই তিনি বায়আত দিতে অস্বীকৃতি জানান।

কুফাবাসীদের চিঠি

ইরাকের কুফা শহরের বহু মানুষ ইমাম হুসাইন (রা.)-কে শত শত চিঠি পাঠান।

তারা লিখেছিলেন—

“আপনি কুফায় আসুন। আমরা আপনার নেতৃত্বে ন্যায়ের সরকার প্রতিষ্ঠা করব।”

এই আহ্বান যাচাই করার জন্য ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর বিশ্বস্ত আত্মীয় মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে কুফায় পাঠান। প্রথমদিকে হাজার হাজার মানুষ তাঁর হাতে বায়আত করেন। কিন্তু পরে ইয়াজিদের গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফায় এসে কঠোর দমননীতি চালু করেন। ভয়ে বহু মানুষ সরে যান। শেষ পর্যন্ত মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) শহীদ হন।

তবুও কেন ইমাম হুসাইন (রা.) যাত্রা থামালেন না?

এ প্রশ্ন আজও ইতিহাসে আলোচিত।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তিনি বিশ্বাস করতেন— সত্যের পথে থাকা মানুষের দায়িত্ব হলো অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা। তিনি যুদ্ধ করতে বের হননি। তিনি বের হয়েছিলেন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে।

তাঁর সঙ্গে ছিলেন—

  • পরিবারের সদস্যরা
  • নারী ও শিশু
  • আত্মীয়স্বজন
  • অল্পসংখ্যক বিশ্বস্ত সঙ্গী

মোট সদস্য ছিলেন প্রায় ৭২ জন (কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য দেখা যায়)। অন্যদিকে ইয়াজিদের বাহিনীর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার।

সামনে কী ঘটতে চলেছিল?

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাফেলা মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করে।

তারা জানতেন না, কয়েক দিনের মধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। কারবালার মরুভূমিতে অপেক্ষা করছিল এক অবরোধ, তৃষ্ণা, শিশুদের কান্না এবং অবশেষে আশুরার সেই রক্তাক্ত সকাল।

  • মক্কা থেকে কারবালা পর্যন্ত যাত্রাপথ
  • ১ মহররম থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত প্রতিদিন কী কী ঘটেছিল
  • কখন পানি বন্ধ করা হয়েছিল
  • হুর ইবনে ইয়াজিদের ভূমিকা
  • ৯ মহররমের (তাসুয়া) রাতের ঘটনা
  • আশুরার আগের শেষ রাতের ইতিহাস

পর্ব ২ Muharram and Karbala History: মক্কা থেকে কারবালার যাত্রা এবং ১ থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত দিনভিত্তিক ঘটনা।

(পর্ব–১-এ আমরা জেনেছিলাম কেন ইমাম হুসাইন (রা.) ইয়াজিদের বায়আত গ্রহণ করেননি এবং কীভাবে কারবালার ঘটনার সূচনা হয়। এবার চলুন, দিন ধরে দেখি কারবালার সেই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো।)

কারবালার পথে যাত্রা

৬০ হিজরির জিলহজ মাসে ইমাম হুসাইন (রা.) মক্কা ত্যাগ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য যুদ্ধ করা ছিল না। তিনি কুফাবাসীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেখানে যাচ্ছিলেন, যাতে পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখতে পারেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্য, নারী, শিশু এবং অল্পসংখ্যক বিশ্বস্ত সঙ্গী।

পথিমধ্যে তিনি জানতে পারেন, কুফায় পাঠানো তাঁর প্রতিনিধি মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) শহীদ হয়েছেন। অনেকেই তাঁকে ফিরে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, সত্যের পথ থেকে ফিরে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

১ মহররম, ৬১ হিজরি কারবালার দিকে অগ্রযাত্রা

ইসলামী নতুন বছরের প্রথম দিন।

এই সময়ে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাফেলা ইরাকের মরুপ্রান্তরের দিকে এগিয়ে চলেছে। অপরদিকে কুফার গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ বিভিন্ন স্থানে সৈন্য মোতায়েন করেন, যাতে হুসাইন (রা.) কুফায় প্রবেশ করতে না পারেন।

কুফার সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ছিলেন। অনেকেই প্রকাশ্যে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পাশে দাঁড়ানোর সাহস হারিয়ে ফেলেন।

২ মহররম, কারবালায় পৌঁছানো

২ মহররম ৬১ হিজরিতে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাফেলা ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদীর কাছাকাছি এক মরুভূমিতে পৌঁছায়। সেই স্থানটির নাম ছিল কারবালা। এই দিনই ইয়াজিদের বাহিনীর সেনাপতি হুর ইবনে ইয়াজিদ আর-রিয়াহি ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাফেলাকে থামিয়ে দেন। হুর প্রথমদিকে যুদ্ধ শুরু করেননি। তিনি শুধু নির্দেশ পালন করে কাফেলাকে এমন স্থানে থামান, যেখান থেকে কুফায় যাওয়া সম্ভব ছিল না।

ইমাম হুসাইন (রা.) জিজ্ঞেস করেন,

“এই স্থানের নাম কী?”

কেউ উত্তর দেন,

“কারবালা।”

ইমাম হুসাইন (রা.) তখন বলেন,

“এখানেই আমাদের পরীক্ষা হবে।”

৩ মহররম, সৈন্য সমাবেশ শুরু

এই দিন থেকে ইয়াজিদের পক্ষে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্য আসতে শুরু করে। প্রথমে কয়েকশ সৈন্য থাকলেও ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গে থাকা লোকসংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক ডজন। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁদের সংখ্যা প্রায় ৭২ জন বলা হয়েছে, যদিও কিছু সূত্রে এই সংখ্যা কিছুটা ভিন্ন।

৪ মহররম, অবরোধ আরও কঠোর

ইয়াজিদের সেনারা চারদিক থেকে কারবালাকে ঘিরে ফেলে। ইমাম হুসাইন (রা.) বারবার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চান।

তিনি প্রস্তাব দেন—

  • তাঁকে ফিরে যেতে দেওয়া হোক।
  • অথবা সীমান্তে চলে যেতে দেওয়া হোক।
  • অথবা ইয়াজিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়া হোক।

কিন্তু কোনো প্রস্তাবই গ্রহণ করা হয়নি।

৫ মহররম, উত্তেজনা বাড়তে থাকে

ইয়াজিদের বাহিনীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। কারবালার পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবুও ইমাম হুসাইন (রা.) যুদ্ধ শুরু করেননি। তিনি তাঁর সঙ্গীদের ধৈর্য ধরতে বলেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে বলেন।

৬ মহররম, শেষবারের মতো সমঝোতার চেষ্টা

ইমাম হুসাইন (রা.) আবারও যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেন।

তিনি জানান,

“আমি যুদ্ধ করতে আসিনি।”

কিন্তু কুফার গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্দেশ ছিল স্পষ্ট—

বায়আত অথবা যুদ্ধ।

৭ মহররম , ফোরাত নদীর পানি বন্ধ

কারবালার ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় শুরু হয় এই দিন। ইয়াজিদের বাহিনী ফোরাত নদীর পানি সংগ্রহের পথ বন্ধ করে দেয়।

শুধু যোদ্ধারাই নয়—

  • নারী
  • শিশু
  • বৃদ্ধ

সবার জন্য পানির পথ বন্ধ হয়ে যায়। তৃষ্ণায় শিশুদের কান্না চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে এই ঘটনাই কারবালার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করা হয়।

৮ মহররম , তৃষ্ণা চরমে

এই দিন পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কিছু সাহাবি রাতে গোপনে পানি আনার চেষ্টা করেন। হজরত আব্বাস (রা.)-সহ কয়েকজন সাহসী যোদ্ধা পানির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। কিছু পানি আনা গেলেও তা সবার জন্য যথেষ্ট ছিল না। শিশুদের কান্নায় পুরো শিবির ভারী হয়ে ওঠে।

৯ মহররম (তাসুয়া)  যুদ্ধের আগের শেষ রাত

এই দিন বিকেলে ইয়াজিদের সেনাপতি উমর ইবনে সাদ যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। ইমাম হুসাইন (রা.) এক রাত সময় চান।

তিনি বলেন,

“আমাদের আজকের রাতটি ইবাদতে কাটাতে দিন।”

সেই অনুমতি দেওয়া হয়। রাতে ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর সব সঙ্গীকে একত্র করেন।

তিনি বলেন,

“আগামীকাল আমাদের অনেকেই শহীদ হব। তোমরা চাইলে এখনই চলে যেতে পারো। আমি কাউকে বাধা দেব না।”

এরপর তিনি শিবিরের বাতি নিভিয়ে দেন, যাতে কেউ চাইলে লজ্জা না পেয়ে চলে যেতে পারেন।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী— একজনও তাঁকে ছেড়ে যাননি।

সবাই বলেছিলেন,

“আমরা আপনাকে একা রেখে যাব না।”

সেই রাতটি ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং আত্মত্যাগের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে কেটেছিল।

১০ মহররম (আশুরার সকাল) ,ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সকাল

ফজরের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে দিনটি শুরু হয়। ইমাম হুসাইন (রা.) শেষবারের মতো উভয় পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন,

“আমার পরিচয় কি তোমরা জানো না? আমি কি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র নই?”

কিন্তু পরিস্থিতি আর বদলায়নি। অল্পসংখ্যক একদল সত্যের সৈনিকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক সেনাবাহিনী। সকালের সূর্য উঠতেই শুরু হয় ইতিহাসের সেই যুদ্ধ, যা আজও মানবতার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়।

পর্ব ৩ Muharram and Karbala History: ১০ মহররম (আশুরা)-এর ঘণ্টাভিত্তিক যুদ্ধ, ৭২ জন শহীদের পরিচয়, ১১ মহররমের ঘটনা, কারবালার শিক্ষা

(পর্ব–১-এ আমরা কারবালার পটভূমি এবং পর্ব–২-এ ১ থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহ জেনেছি। এবার জানব আশুরার দিনের যুদ্ধ, ১১ মহররমে কী ঘটেছিল এবং কারবালার শিক্ষা।)

১০ মহররম (আশুরা) ফজরের নামাজ দিয়ে শুরু

৬১ হিজরির ১০ মহররম। কারবালার মরুভূমিতে সূর্য ওঠার আগেই ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীরা ফজরের নামাজ আদায় করেন।

তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন,

“ধৈর্য ধরো। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। আজকের কষ্টের পরই রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ।”

অন্যদিকে ইয়াজিদের বিশাল সেনাবাহিনী যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।

যুদ্ধ শুরুর আগে শেষ ভাষণ

ইমাম হুসাইন (রা.) শেষবারের মতো প্রতিপক্ষের সামনে এগিয়ে যান।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন,

  • আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র।
  • তোমরা কি আমাকে চেনো না?
  • যদি আমার কথা বিশ্বাস না করো, তাহলে সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করো।

তিনি আরও বলেন,

“আমি যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা যদি আমাকে না চাও, তবে আমাকে ফিরে যেতে দাও।”

কিন্তু তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।

যুদ্ধ শুরু

সকালের কিছুক্ষণ পর যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমে একক লড়াই (মুবারাযা) হয়। এরপর শুরু হয় সম্মুখসমরের যুদ্ধ। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গীরা একে একে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করতে থাকেন।

একে একে শহীদ হতে থাকেন সাহাবি ও আত্মীয়রা

কারবালার ইতিহাসে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেউ একসঙ্গে যুদ্ধ করেননি। প্রত্যেকে নিজের পালায় যুদ্ধ করেছেন।

একে একে শহীদ হতে থাকেন—

  • ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গীরা
  • তাঁর আত্মীয়রা
  • রাসুল (সা.)-এর পরিবারের সদস্যরা

তাদের প্রত্যেকেই জানতেন, ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম।

হুর ইবনে ইয়াজিদের পরিবর্তন

কারবালার অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা এটি। যিনি প্রথমে ইয়াজিদের পক্ষে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পথ আটকে দিয়েছিলেন, সেই হুর ইবনে ইয়াজিদ যুদ্ধ শুরুর আগে নিজের ভুল বুঝতে পারেন। তিনি ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাছে এসে ক্ষমা চান। ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এরপর হুর সত্যের পক্ষে যুদ্ধ করে শহীদ হন।

আলী আকবর (রা.)

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর যুবক পুত্র আলী আকবর (রা.) যুদ্ধের অনুমতি চান। বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর চেহারা ও চরিত্র রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। তিনি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং শহীদ হন। ছেলের শাহাদাতের পরও ইমাম হুসাইন (রা.) ধৈর্য ধারণ করেন।

কাসিম ইবনে হাসান (রা.)

ইমাম হাসান (রা.)-এর কিশোর পুত্র কাসিম (রা.)-ও যুদ্ধের অনুমতি চান। প্রথমে ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁকে থামাতে চাইলেও পরে অনুমতি দেন। তিনি অল্প বয়সেই শহীদ হন।

হজরত আব্বাস (রা.)

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সৎভাই হজরত আব্বাস (রা.) ছিলেন সাহস ও বিশ্বস্ততার প্রতীক। শিশুদের জন্য পানি আনতে তিনি ফোরাত নদীর দিকে যান। তিনি পানি সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেও ফিরে আসার পথে আক্রমণের শিকার হন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি শহীদ হন এবং পানির মশক শিবিরে পৌঁছাতে পারেননি। আজও তাঁর এই আত্মত্যাগ বিশ্বজুড়ে স্মরণ করা হয়।

আলী আসগর (রা.)

কারবালার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি হলো ছয় মাসের শিশু আলী আসগর (রা.)-এর ঘটনা।

বহু ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তৃষ্ণায় কাতর শিশুকে কোলে নিয়ে ইমাম হুসাইন (রা.) শিবিরের বাইরে এসে বলেন,

“যদি আমার প্রতি তোমাদের অভিযোগ থাকে, এই শিশুর কী অপরাধ? অন্তত তাকে একটু পানি দাও।”

এরপর কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণনার পার্থক্য রয়েছে। তবে মুসলিম ঐতিহ্যের বহু গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, শিশুটি সেই দিন প্রাণ হারায়।

দুপুরের নামাজ

যুদ্ধ চলাকালেও নামাজ বন্ধ হয়নি। সাহাবিদের একটি দল নিজেদের জীবন বিপন্ন করে দাঁড়িয়ে থেকে অন্যদের নামাজ আদায়ের সুযোগ করে দেন। তাঁদের অনেকেই সেই অবস্থাতেই শহীদ হন।

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শেষ লড়াই

বিকেলের দিকে প্রায় সবাই শহীদ হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত একাই যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইমাম হুসাইন (রা.)। তিনি অসাধারণ সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। অবশেষে তিনি গুরুতর আহত হন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১০ মহররম ৬১ হিজরিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে কারবালার যুদ্ধ শেষ হয়।

১০ মহররমের সন্ধ্যা

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর—

  • শহীদদের দেহ কারবালার ময়দানে পড়ে থাকে।
  • নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়।
  • শিবির লুট করা হয়।
  • তাঁবুগুলোতে আগুন লাগানো হয় বলে বহু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

হজরত জয়নাব (রা.) এই কঠিন সময়ে পরিবারকে সাহস জোগান।

১১ মহররমে কী ঘটেছিল?

১১ মহররমের দিনটি ছিল কারবালার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা।

এই দিন—

১. বন্দিদের কুফায় নিয়ে যাওয়া হয়

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পরিবারের নারী ও শিশুদের বন্দি করে কুফার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

২. শহীদদের মরদেহ

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, কারবালার নিকটবর্তী বানু আসাদ গোত্রের লোকজন পরে এসে শহীদদের দাফনের ব্যবস্থা করেন।

৩. কুফায় ভাষণ

কুফায় পৌঁছে হজরত জয়নাব (রা.) ও ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তাঁদের বক্তব্যে কারবালার ঘটনার প্রকৃত বিবরণ মানুষের সামনে আসে।

৪. পরে দামেস্কে যাত্রা

পরবর্তী সময়ে বন্দিদের সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও হজরত জয়নাব (রা.) ও ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) সত্যের পক্ষে দৃঢ় বক্তব্য রাখেন বলে ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

কারবালার পর কী হয়েছিল? ইয়াজিদের শেষ পরিণতি কী ছিল?

কারবালার যুদ্ধ শেষ হলেও ইতিহাসের অধ্যায় তখনও শেষ হয়নি।

বন্দিদের কুফা ও দামেস্কে নিয়ে যাওয়া

১১ মহররমের পর ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পরিবারের নারী ও শিশুদের বন্দি করে প্রথমে কুফায় গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের দরবারে এবং পরে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে হজরত জয়নাব (রা.) ও ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ভাষণ দেন। তাঁদের বক্তব্যে উপস্থিত অনেকেই বুঝতে পারেন যে, কারবালায় যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁরা ছিলেন মহানবী (সা.)-এর পরিবার।

ইতিহাসে উল্লেখ আছে, এই ঘটনার পর জনমতের একটি অংশ ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে।

ইয়াজিদ কি অনুতপ্ত হয়েছিলেন?

কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে, পরে ইয়াজিদ বন্দিদের সঙ্গে তুলনামূলক নমনীয় আচরণ করেন এবং তাঁদের মদিনায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন । তবে তিনি সত্যিই অনুতপ্ত হয়েছিলেন কি না, নাকি রাজনৈতিক চাপে এমন করেছিলেন, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ইয়াজিদের শাসনের শেষ বছরগুলো

কারবালার ঘটনার পর ইয়াজিদের শাসন আরও অস্থির হয়ে ওঠে।

এরপর একের পর এক বড় ঘটনা ঘটে—

  • মদিনায় হাররার যুদ্ধ, যেখানে বহু মানুষ নিহত হন।
  • মক্কায় অভিযান চালানো হয়।
  • কাবা শরিফ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও এই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বহু ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

এসব ঘটনার ফলে ইয়াজিদের জনপ্রিয়তা আরও কমে যায়।

ইয়াজিদের মৃত্যু

ইয়াজিদ মাত্র প্রায় তিন বছর শাসন করেন। ৬৪ হিজরি (৬৮৩ খ্রিস্টাব্দ) সালে, প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রগুলো একমত নয়। কেউ বলেন তিনি অসুস্থতায় মারা যান।

আবার লোকমুখে এমন বর্ণনাও প্রচলিত আছে যে তিনি শিকার করতে গিয়ে বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় মারা যান, কিংবা মানসিক অস্থিরতায় ভুগেছিলেন। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় শুধু এটুকুই যে, ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইয়াজিদের মৃত্যু হয় এবং তাঁর শাসনের অবসান ঘটে।

ইয়াজিদের পর কী হয়?

ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মুয়াবিয়া দ্বিতীয় (Mu’awiya II) অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় বসেন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তিনি খুব অল্প সময় শাসন করেন এবং পরে সরে দাঁড়ান বা অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর উমাইয়া শাসনব্যবস্থায় নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।

কারবালার প্রকৃত বিজয়ী কে?

কারবালার ময়দানে সামরিকভাবে ইয়াজিদের বাহিনী জয়ী হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে অধিকাংশ মুসলিম ঐতিহাসিক মনে করেন, নৈতিক বিজয় ছিল ইমাম হুসাইন (রা.)-এর। আজ প্রায় ১,৪০০ বছর পরও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। অন্যদিকে ইয়াজিদের শাসন আজও ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে আলোচিত।

“দক্ষিণ এশিয়ার জারিগান, পুঁথি ও লোকসাহিত্যে মুহাম্মদ হানাফিয়্যাকে নিয়ে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বহু কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব কাহিনি ঐতিহাসিকভাবে সর্বসম্মত নয়। নির্ভরযোগ্য প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী, কারবালার প্রতিশোধের প্রধান সামরিক অভিযান কয়েক বছর পরে মুখতার আল-সাকাফির বিদ্রোহের সময় সংঘটিত হয়।”

কারবালার যুদ্ধ কি ক্ষমতার জন্য ছিল?

বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে, কারবালার মূল প্রশ্ন ছিল নীতি বনাম অন্যায়

ইমাম হুসাইন (রা.) যদি শুধু ক্ষমতা চাইতেন, তাহলে তিনি শুরুতেই ইয়াজিদের বায়আত গ্রহণ করতে পারতেন।

কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন—

“অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে শান্তিতে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যের পথে দাঁড়িয়ে আত্মত্যাগ করা শ্রেয়।”

কারবালার শিক্ষা

কারবালার ঘটনা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি শিক্ষা।

এই ইতিহাস আমাদের শেখায়—

  • সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
  • অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা উচিত নয়।
  • ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।
  • ধৈর্য ও ঈমান মানুষকে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও শক্তি দেয়।
  • ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

আজ কেন মহররম পালন করা হয়?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানরা বিভিন্নভাবে মহররম পালন করেন।

অনেক মুসলিম ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখেন, যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। আবার বিশেষ করে শিয়া মুসলিমরা কারবালার শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠান পালন করেন। পালনের ধরন ভিন্ন হলেও, ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কারবালার শিক্ষার গুরুত্ব মুসলিম ঐতিহ্যে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

কারবালার যুদ্ধ ছিল মাত্র এক দিনের যুদ্ধ, কিন্তু এর প্রভাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবসভ্যতার ইতিহাসে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। ১০ মহররম শুধু একটি তারিখ নয়। এটি সত্য, ন্যায়, ধৈর্য এবং আত্মত্যাগের এক অবিনশ্বর প্রতীক। প্রতি বছর মহররম এলে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ শুধু একটি যুদ্ধকে স্মরণ করেন না, বরং স্মরণ করেন সেই আদর্শকে, যা অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার শিক্ষা দেয়।

ঐতিহাসিক নোট: কারবালার মূল ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য থাকলেও, কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা, সংলাপ, সৈন্যসংখ্যা এবং ব্যক্তিবিশেষের শেষ মুহূর্ত সম্পর্কে বিভিন্ন প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে। তাই এই লেখায় ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বহুল উদ্ধৃত ঐতিহাসিক তথ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

Syed Mosharaf Hossain
Syed Mosharaf Hossainhttps://syedmosharafhossain.in/
Syed Mosharaf Hossain is a visionary educator, technical innovator, and the Principal of Purbasthali-II Government ITI, West Bengal. An Electronics & Communication Engineer, he is the creator of the internationally recognized "Arduino-based Smart Shoe" for women’s safety, featured in the World Book of Records. As the Founder of SD ONUPRON GROUP, Syed has over six years of expertise in SEO, web development, and digital journalism. Honored as the "Principal of the Year" at the Asia Education Conclave 2025, he remains dedicated to driving technical innovation and mentoring future professionals in India's education sector.

Table of contents [hide]

Read more

Local News