সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
Chorebagan Sarbojanin Durga Puja: উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক আহতকে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শনিবার, ১৭ অক্টোবরের এই দুর্ঘটনার পর রবিবার মুখ্যমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে তদন্তের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার গাফিলতি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Read More : কলকাতার চোরবাগান পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু! মৃতদের নামের তালিকা দেখুন
১৯টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, একাধিক পরিবারের সদস্যের মৃত্যু
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এখনও পর্যন্ত ১৯টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কথা তাঁর কাছে এসেছে। কয়েকটি পরিবারের একাধিক সদস্যও এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নিহতদের পরিবারের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বাসিন্দারাও রয়েছেন। বিহারের মুজফ্ফরপুরের পরিবারের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রায় ১২ থেকে ১৩টি মৃতের পরিবারের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন। সেই সময় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী, মুখ্যসচিব এবং পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকরা।
পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই দুর্ঘটনায় বহু পরিবার তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই ক্ষতিপূরণ এবং চাকরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।
সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে কলকাতা পুলিশ
চোরবাগানের দুর্ঘটনার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশ ইতিমধ্যেই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে।
দুর্ঘটনার সময় ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে কারা ছিলেন, কোথায় কোনও ত্রুটি হয়েছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই তালিকায় পুজো কমিটির স্বেচ্ছাসেবক, অস্থায়ী হোমগার্ড, পুলিশকর্মী এবং পুজো কমিটির নিয়োগ করা বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মীরাও থাকতে পারেন।
অর্থাৎ, তদন্তে যাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে ত্রুটির প্রমাণ মিলবে, তাঁর বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তদন্তে বসতে পারে সিট, বিচারবিভাগীয় তদন্তেরও উদ্যোগ
এই মর্মান্তিক ঘটনার তদন্তে কোনও রকম গাফিলতি রাখা হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে একজন কর্মরত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্তের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ জানাবেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পুজোর অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কলকাতা পুলিশ বা অন্য কোনও সরকারি সংস্থার কোনও ত্রুটি কিংবা গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
এ ছাড়া অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিয়ে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠনের কথাও বলেছেন তিনি।
তবে বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্তের ব্যবস্থা এবং সিট গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি ঘোষণা থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিহতদের পরিবার পাবে ২৫ লক্ষ টাকা ও সরকারি চাকরি
দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারগুলির জন্য বড় আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী:
- ক্ষতিপূরণ: প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে।
- সরকারি চাকরি: প্রত্যেক নিহতের পরিবার থেকে একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে।
- আহতদের আর্থিক সহায়তা: প্রত্যেক আহত ব্যক্তিকে ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে।
- চিকিৎসা: আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য সরকার নেবে।
- বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা: চিকিৎসার পর আহতদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, অর্থ দিয়ে কোনও মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবুও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সদস্যরাও
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা। তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন, যাঁদের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল।
কোনও পরিবারের সদস্য রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, আবার কোনও পরিবার কাপড় কাটার কাজ করে সংসার চালায়। এমন পরিবারের কলেজপড়ুয়া মেয়ের মৃত্যু তাঁদের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে।
ছোট শিশুর মৃত্যু থেকে শুরু করে পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য বা পড়াশোনা করা তরুণ-তরুণীর মৃত্যু, প্রতিটি ঘটনাই অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
২৫ জন আহত, একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় মোট ২৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বা সংকটজনক, অন্য ২৪ জন বিপদমুক্ত রয়েছেন বলে তিনি জানান।
আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে প্রত্যেকের চিকিৎসার দায়িত্ব রাজ্য সরকার নিয়েছে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
চিকিৎসার পর আহতদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে। দুর্ঘটনায় যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবার যাতে চিকিৎসা ও যাতায়াত নিয়ে সমস্যায় না পড়ে, সে দিকেও নজর রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
মুজফ্ফরপুরের মৃতদের দেহ বাড়ি পৌঁছে দেবে রাজ্য সরকার
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বাসিন্দারাও প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিহারের মুজফ্ফরপুরের বাসিন্দাদের কথাও মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
তিনি জানান, মৃতদের দেহ তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দ্রুত পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করা হবে। মুজফ্ফরপুরের মৃতদের দেহ রাজ্য সরকারের এসি ডেড বডি ক্যারিয়ার এবং প্রটোকল আধিকারিকের সহায়তায় পুলিশের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এর ফলে দূরবর্তী রাজ্যে বসবাসকারী শোকাহত পরিবারগুলিকে মৃতদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস মিলেছে।
থিমের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য বেশি: মুখ্যমন্ত্রী
দুর্গাপুজোর থিম এবং মণ্ডপের নকশার চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্যান্ডেলের ভিতরে থিমের জন্য অন্ধকার রাখা বা বিশেষ ধরনের সাজসজ্জা করার ক্ষেত্রে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুজোর বাকি দিনগুলিতে পুলিশ ও প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে অতিরিক্ত ভিড়ের সময় দর্শনার্থীদের সতর্ক থাকা, নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশ মানা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাতিল একাধিক সরকারি কর্মসূচি
চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর শোকের আবহে একাধিক কর্মসূচি স্থগিত রাখার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরের দিনের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-সহ রাজ্যের মন্ত্রী, বিধায়ক ও সাংসদদের সঙ্গে নির্ধারিত কর্মসূচিগুলি স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের সংস্কৃতি ও পর্যটন দফতরের দুর্গাপুজো সংক্রান্ত আগামী কয়েক দিনের কর্মসূচিও স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
তবে দুর্গাপুজো সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে না বলে স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, পুজো চলবে এবং ভক্তরা মণ্ডপে গিয়ে দেবী দুর্গার দর্শন ও পুষ্পাঞ্জলি দিতে পারবেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তির বিষয়টিতে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না বলেও তিনি জানান।
নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন সরকার নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে থাকবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার বিধায়কেরাও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, আহতদের চিকিৎসা এবং পরিবারের পুনর্বাসনের বিষয়গুলিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শেষ কথা Chorebagan Sarbojanin Durga Puja
চোরবাগানের দুর্গাপুজো মণ্ডপে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা উৎসবের সময় জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, নিহতদের পরিবার ২৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ও একটি সরকারি চাকরি পাবে। আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ঘোষিত সাহায্য বাস্তবে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এখন প্রশাসনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে এলে এই দুর্ঘটনার কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
