সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
WB Parichay Prakalpa 2026: সন্তান জন্মানোর পর একের পর এক সরকারি নথি তৈরি করতে গিয়ে অভিভাবকদের আর বারবার সরকারি দফতরে ছুটতে হবে না। নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরির প্রক্রিয়াকে সহজ করতে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় শুরু হয়েছে একটি নতুন পাইলট প্রকল্প। নাম ‘পরিচয়’।
জলপাইগুড়ির মাল মহকুমা প্রশাসনের উদ্যোগে চালু হওয়া এই ‘পরিচয়’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল, একটি শিশুর জন্মের পর তার প্রয়োজনীয় সরকারি নথিগুলি যতটা সম্ভব দ্রুত এবং সমন্বিতভাবে তৈরি করা। বিশেষ করে চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকার সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
WB Parichay Prakalpa: সন্তান জন্মের পর কমবে সরকারি দফতরে দৌড়ঝাঁপ
একটি শিশুর জন্মের পর জন্ম শংসাপত্র, আধার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জাতিগত শংসাপত্র তৈরি করতে অনেক পরিবারকেই আলাদা আলাদা জায়গায় যোগাযোগ করতে হয়। কোথাও আবেদন, কোথাও নথি জমা, আবার কোথাও যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
দূরবর্তী গ্রাম বা চা-বাগান এলাকায় বসবাসকারী পরিবারের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি। একদিকে সদ্যোজাত সন্তানকে সামলানো, অন্যদিকে কাজের জায়গা থেকে ছুটি নিয়ে সরকারি দফতরে যাতায়াত করা অনেক পরিবারের কাছেই যথেষ্ট কঠিন।
এই সমস্যার কথা মাথায় রেখেই ‘পরিচয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
WB Parichay Prakalpa: কী কী নথি মিলবে?
‘পরিচয়’ প্রকল্পের আওতায় নবজাতকের জন্য মূলত তিন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১. জন্ম শংসাপত্র
শিশুর জন্মের সরকারি প্রমাণ হিসেবে জন্ম শংসাপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবায় এই নথির প্রয়োজন হতে পারে।
২. আধার
শিশুর আধার এনরোলমেন্টের প্রক্রিয়াও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে অভিভাবকদের আলাদাভাবে আধার সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার জন্য ছুটতে হবে না।
৩. জাতিগত শংসাপত্র
যে নবজাতক তপশিলি জাতি বা তপশিলি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের পর জাতিগত শংসাপত্র তৈরির ব্যবস্থাও এই প্রকল্পের মাধ্যমে করা হবে।
হাসপাতাল থেকেই শুরু হবে প্রক্রিয়া
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শিশুর জন্মের পর হাসপাতাল থেকেই নথি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে এই পরিষেবা চালু করা হয়েছে। শিশুর জন্মের পর হাসপাতালেই জন্ম শংসাপত্রের প্রয়োজনীয় ফর্ম পূরণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
একইসঙ্গে আধার এনরোলমেন্ট এবং জাতিগত শংসাপত্র তৈরির প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াও সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আধার তৈরির পর কী হবে?
এই ব্যবস্থায় ডাক বিভাগের সহযোগিতাও থাকছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় একজন পোস্ট অফিস কর্মী উপস্থিত থাকবেন আধার সংক্রান্ত কাজের জন্য।
আধার এনরোলমেন্ট নম্বর তৈরি হওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট পোর্টালে আপডেট করা হবে। এরপর স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত বা পুরসভার কাছে প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন পৌঁছবে।
জাতিগত শংসাপত্রের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত বা পুরসভার কর্মীরা পরিবারের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। অর্থাৎ, পুরো প্রক্রিয়াটিকে হাসপাতাল, প্রশাসন, স্থানীয় সংস্থা এবং ডাক বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
WB Parichay Prakalpa: এক মাসের মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছনোর লক্ষ্য
‘পরিচয়’ প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল নথি পাওয়ার ক্ষেত্রে সময় কমানোর চেষ্টা।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ঠিকঠাক সম্পন্ন হলে প্রায় ২১ দিনের মধ্যে নথিগুলি প্রস্তুত করার লক্ষ্য রয়েছে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে নথি পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে বা একাধিকবার অফিসে গিয়ে নথি সংগ্রহ করার প্রয়োজন অনেকটাই কমতে পারে।
চা-বাগান এলাকার মানুষের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মালবাজার মহকুমার বিস্তীর্ণ অংশ চা-বাগান অধ্যুষিত। এই এলাকার বহু পরিবার প্রতিদিনের কাজের উপর নির্ভরশীল। সরকারি দফতরে একটি কাজের জন্য যেতে হলে শুধু যাতায়াতের খরচই নয়, কাজের দিনও নষ্ট হতে পারে।
একজন মা সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়ার পর শিশুকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সরকারি অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়াবেন, সেটিও বাস্তবে যথেষ্ট কঠিন।
‘পরিচয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই ধরনের পরিবারের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে সময়, যাতায়াতের খরচ এবং সরকারি দফতরে বারবার যাওয়ার ঝামেলা, তিনটিই কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশাসনের একাধিক দফতর একসঙ্গে কাজ করবে
এই প্রকল্পের বিশেষত্ব শুধু নথি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া নয়। এর পিছনে রয়েছে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় করার একটি পরিকল্পনা।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য দফতর এবং ভারতীয় ডাক বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিষেবাটি পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকল্পটি সফল হলে মাল মহকুমার আরও হাসপাতালেও পরিষেবাটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে একটি শিশুর জন্মকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় সরকারি নথি তৈরির প্রক্রিয়াটি আরও সংগঠিত করা সম্ভব হতে পারে।
‘WB Parichay Prakalpa: পরিচয়’ প্রকল্পের নামকরণের অর্থও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ
একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে তার সরকারি পরিচয়ের নথিও তৈরি হতে শুরু করে। জন্ম শংসাপত্র, আধার এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জাতিগত শংসাপত্র ভবিষ্যতে তার বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সেই জায়গা থেকেই প্রকল্পটির নাম ‘পরিচয়’ রাখা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রশাসনের লক্ষ্য, শিশুর জন্মের পর পরিবারের হাতে প্রয়োজনীয় নথিগুলি দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের হয়রানি কমানো।
ইতিমধ্যেই কয়েকটি পরিবার সুবিধা পেয়েছে
প্রকল্পটি শুধু ঘোষণার পর্যায়ে নেই, ইতিমধ্যেই কয়েকজন নবজাতকের পরিবার এই পরিষেবার সুবিধা পেয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কয়েকজন সদ্যোজাতের অভিভাবকের হাতেও নথি তুলে দেওয়া হয়।
অভিভাবকদের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে, আগে যে কাজের জন্য বারবার হাসপাতালে বা অন্য জায়গায় যেতে হত, নতুন ব্যবস্থায় সেই ঝামেলা অনেকটাই কমেছে।
রাজ্যে প্রথম এমন উদ্যোগ?
‘পরিচয়’ প্রকল্পকে প্রশাসনের তরফে পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের একটি পাইলট উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এটি বর্তমানে পাইলট পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পটি কীভাবে কাজ করছে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা সুবিধা পাচ্ছেন, তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে আরও হাসপাতাল বা অন্য এলাকায় এই ধরনের পরিষেবা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সরকারি পরিষেবা যদি মানুষের দরজায় পৌঁছয়, সুবিধা হবে সাধারণ মানুষেরই
সরকারি নথি তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় নথি নয়, বরং প্রক্রিয়া। কোন অফিসে যেতে হবে, কোথায় আবেদন করতে হবে, কখন যেতে হবে, কোন নথি লাগবে এবং আবেদন করার পর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, এই পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেক পরিবারের কাছে জটিল হয়ে ওঠে।
‘পরিচয়’ প্রকল্প সেই জায়গাতেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারগুলির জন্য যদি হাসপাতাল থেকেই প্রক্রিয়া শুরু করা যায় এবং পরবর্তী ধাপগুলির জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন দফতর নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমতে পারে।
সন্তানের জন্মের পর বাবা-মায়ের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শিশুর যত্ন। সেই সময় যদি জন্ম শংসাপত্র, আধার বা জাতিগত শংসাপত্র তৈরির জন্য একের পর এক সরকারি দফতরে যেতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে চাপ ও হয়রানি।
জলপাইগুড়ির মাল মহকুমায় শুরু হওয়া ‘পরিচয়’ পাইলট প্রকল্প সেই সমস্যারই একটি নতুন সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করছে। হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রশাসন, স্থানীয় সংস্থা এবং ডাক বিভাগের সমন্বয়ে নবজাতকের প্রয়োজনীয় নথি দ্রুত তৈরি করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি সফলভাবে এগোলে শুধু মালবাজার নয়, ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও এমন পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে ‘পরিচয়’ প্রকল্পটি শুধু একটি নতুন প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং সরকারি পরিষেবা মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
