দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি কেন ব্যবহার করা হয়? জানুন ‘পুণ্যমাটি’র ইতিহাস ও প্রচলিত বিশ্বাস

সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

WhatsApp Group
Join Now

দুর্গাপ্রতিমায় যৌনপল্লির মাটি: শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই বাঙালির কাছে শুধু পুজো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন রীতি, লোকাচার, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে এমন কিছু প্রথা, যা আজও মানুষের কৌতূহলের কারণ।

এর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হল দুর্গাপ্রতিমা তৈরির মাটির সঙ্গে যৌনপল্লির মাটির সম্পর্ক। অনেকের কাছে এটি অবাক করার মতো বিষয়। প্রশ্ন ওঠে, দুর্গাপ্রতিমার মতো পবিত্র প্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির দরজার সামনের মাটি কেন নেওয়া হয়? এই মাটিকে কেন কোথাও কোথাও ‘পুণ্যমাটি’ বলা হয়? এর পিছনে কি সত্যিই কোনো ধর্মীয় শাস্ত্রের নির্দেশ রয়েছে?

এই বিষয়টি নিয়ে বাংলায় বহু লোককথা ও প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে সব ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় ভিত্তি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই বিষয়টিকে লোকবিশ্বাস ও ঐতিহাসিক তথ্যের পার্থক্য বজায় রেখে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

Google
Add West Bengal Times যুক্ত করুন গুগল-এ পছন্দের উৎস হিসেবে
Add Preference

‘পুণ্যমাটি’ বলতে কী বোঝায়?

দুর্গাপ্রতিমা তৈরির সময় বিভিন্ন ধরনের মাটি সংগ্রহের একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট স্থান থেকে সংগৃহীত মাটিকে অনেক প্রতিমাশিল্পী বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

বাংলার লোকাচারে যৌনপল্লির প্রবেশদ্বারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মাটিকে অনেক সময় ‘পুণ্যমাটি’ নামে উল্লেখ করা হয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সাধারণভাবে বলা হয় না যে পুরো প্রতিমা শুধুমাত্র যৌনপল্লির মাটি দিয়ে তৈরি হয়। প্রতিমার কাঠামো ও মাটি তৈরির কাজে সাধারণত বিভিন্ন উৎসের মাটি, খড় এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়। যৌনপল্লির মাটি থাকলে সেটি নির্দিষ্ট একটি অংশ হিসেবে মিশ্রিত হতে পারে।

Read More : পশ্চিমবঙ্গ থেকে Hyderabad AIG Hospitals-এ চিকিৎসা করাতে যাচ্ছেন? জেনে নিন ঠিকানা, যোগাযোগ, চিকিৎসা ও যাওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

কেন যৌনপল্লির দরজার মাটি?

এই প্রশ্নের উত্তর মূলত পাওয়া যায় লোকবিশ্বাস ও বিভিন্ন প্রচলিত ব্যাখ্যায়।

একটি বহুল প্রচলিত বিশ্বাস হল, কোনো ব্যক্তি যৌনপল্লিতে প্রবেশ করার সময় নিজের সামাজিক পরিচয়, অহংকার ও বাহ্যিক পরিচয় যেন বাইরে রেখে প্রবেশ করেন। সেই কারণে দরজার সামনের মাটিকে প্রতীকীভাবে এমন একটি স্থান হিসেবে দেখা হয়, যেখানে মানুষের সামাজিক ভেদাভেদ মুছে যায়।

এই ব্যাখ্যা থেকেই মাটিকে ‘পুণ্যমাটি’ বলা হয় বলে অনেকের ধারণা।

তবে এটি লোকপ্রচলিত ব্যাখ্যা, সর্বসম্মত ঐতিহাসিক সত্য বা সর্বত্র প্রযোজ্য শাস্ত্রীয় বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

এর সঙ্গে কি কোনো পুরাণের সরাসরি সম্পর্ক আছে?

এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়।

অনেক জায়গায় বিভিন্ন পুরাণকথা বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে এই প্রথাকে যুক্ত করে গল্প বলা হয়। কিন্তু দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের বর্তমান প্রচলিত রীতির পিছনে একটি নির্দিষ্ট পুরাণের সরাসরি নির্দেশ রয়েছে, এমন দাবি নিয়ে সর্বসম্মত প্রামাণ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ সহজে পাওয়া যায় না।

অর্থাৎ, ‘পুরাণে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি নিতেই হবে’, এমনভাবে বিষয়টি বলা ঠিক নয়।

বাংলার দুর্গাপুজোর অনেক রীতির মতো এই প্রথার মধ্যেও সময়ের সঙ্গে লোকাচার, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক ব্যাখ্যা মিশে গেছে।

যৌনপল্লির মানুষদের প্রতি কি এর মধ্যে কোনো সামাজিক বার্তা রয়েছে?

এই প্রথার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।

হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতিতে দেবী দুর্গা শুধু শক্তির প্রতীক নন, তিনি নারীশক্তিরও প্রতীক। সমাজের প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কৃতির সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই ধরনের লোকাচার গুরুত্বপূর্ণ।

যৌনপল্লিতে বসবাসকারী বা কাজ করা নারীরা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বৈষম্য ও নানা ধরনের কলঙ্কের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের এলাকার দরজার মাটিকে প্রতিমা তৈরির উপকরণের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার রীতিকে কেউ কেউ সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

অর্থাৎ, সমাজ যাঁদের অনেক সময় দূরে সরিয়ে রাখে, দেবীর মাটি তৈরির ক্ষেত্রে তাঁদের এলাকার মাটিকেও গ্রহণ করা হচ্ছে।

তবে এটিও মনে রাখা দরকার, এই সামাজিক ব্যাখ্যাটি মূলত আধুনিক সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের অংশ। প্রথাটি শুরু থেকেই এই উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, এমন নিশ্চিত প্রমাণ সব ক্ষেত্রে নেই।

‘পাপের মাটি’ থেকে ‘পুণ্যমাটি’ হওয়ার গল্প

এই প্রথাকে ঘিরে বাংলায় আরও একটি জনপ্রিয় ধারণা রয়েছে।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষ যৌনপল্লিতে প্রবেশ করার আগে নিজের ‘পাপ’ বা সামাজিক কলঙ্ক দরজার বাইরে রেখে যায়। ফলে সেই দরজার সামনের মাটি বিভিন্ন মানুষের জীবনের স্পর্শে পবিত্র হয়ে ওঠে।

এই কারণেই নাকি তাকে ‘পুণ্যমাটি’ বলা হয়। এই গল্পটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও এটিকে লোককথা বা প্রচলিত বিশ্বাস হিসেবে দেখা উচিত। এটিকে বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বলা যায় না।

দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে আর কী কী মাটি ব্যবহার করা হয়?

বাংলার প্রতিমাশিল্পে মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও অঞ্চলভেদে পার্থক্য রয়েছে। প্রতিমার মাটি সাধারণত নদী, পুকুর, খাল বা অন্যান্য নির্দিষ্ট স্থান থেকে সংগ্রহ করা হয়।

প্রতিমাশিল্পীরা মাটি প্রস্তুত করার আগে সেটিকে পরিষ্কার করেন এবং উপযুক্তভাবে মিশ্রণ তৈরি করেন। খড়ের কাঠামোর উপর ধাপে ধাপে মাটি লাগিয়ে প্রতিমার আকৃতি তৈরি করা হয়।

প্রথমে মোটা মাটির স্তর এবং পরে অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম মাটি ব্যবহার করে মুখ, হাত, পা ও অন্যান্য অংশের সূক্ষ্ম আকৃতি তৈরি করা হয়।

এরপর শুকিয়ে যাওয়ার পরে রং, সাজসজ্জা ও অলংকরণের কাজ হয়।

তাই ‘পুণ্যমাটি’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এমন ধারণা করা ঠিক নয় যে দুর্গাপ্রতিমার সম্পূর্ণ মাটি যৌনপল্লি থেকে আসে।

সব দুর্গাপ্রতিমায় কি এই মাটি ব্যবহার করা হয়?

না।

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলার প্রতিটি দুর্গাপুজো কমিটি বা প্রতিমাশিল্পী একই রীতি অনুসরণ করেন না। কোথাও এই প্রথা পালন করা হয়, কোথাও হয় না। অনেক বনেদি বাড়ির পুজো, গ্রামীণ পুজো বা প্রতিমাশিল্পীর নিজস্ব পারিবারিক রীতিতে আলাদা আলাদা নিয়ম রয়েছে। তাই ‘বাংলার সব দুর্গাপ্রতিমায় যৌনপল্লির মাটি ব্যবহার হয়’ বলা ভুল।

তাহলে এই প্রথার আসল গুরুত্ব কোথায়?

এই প্রথার গুরুত্ব শুধু মাটির মধ্যে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতি, লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক ইতিহাস।

দুর্গাপুজো এমন একটি উৎসব, যেখানে দেবীকে কেন্দ্র করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ একত্রিত হন। প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট লোকাচারও সেই বৃহত্তর সংস্কৃতির অংশ।

‘পুণ্যমাটি’র ধারণা সেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরই একটি উদাহরণ।

একদিকে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, অন্যদিকে রয়েছে মানুষের তৈরি সামাজিক ব্যাখ্যা। আর এই দুইয়ের সংমিশ্রণেই প্রথাটি আজও মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করে।

শাস্ত্র বনাম লোকাচার: পার্থক্যটা বোঝা জরুরি

দুর্গাপুজোর সঙ্গে সম্পর্কিত বহু রীতির ক্ষেত্রেই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার।

শাস্ত্রে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকা কোনো নিয়ম এবং মানুষের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোকাচার এক জিনিস নয়।

যৌনপল্লির মাটি সংগ্রহের বিষয়টিও অনেক ক্ষেত্রে লোকাচার, আঞ্চলিক রীতি ও প্রতিমাশিল্পীদের প্রচলিত প্রথার সঙ্গে যুক্ত।

তাই এই বিষয়টি নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি, যেমন ‘এটি না করলে দুর্গাপুজো সম্পূর্ণ হয় না’ বা ‘প্রত্যেক দুর্গাপ্রতিমায় এই মাটি থাকতেই হবে’, তথ্যভিত্তিকভাবে বলা ঠিক নয়।

দুর্গাপুজোর এই অজানা রীতি আমাদের কী শেখায়?

দুর্গাপুজো শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রতিমা তৈরির মাটির মতো একটি সাধারণ বিষয়ের মধ্যেও সমাজ, বিশ্বাস, সংস্কার, লোককথা এবং মানুষের জীবনযাত্রার নানা স্তর জড়িয়ে আছে।

‘পুণ্যমাটি’র গল্প তাই শুধু একটি মাটি সংগ্রহের গল্প নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ধর্মীয় সংস্কৃতির অনেক রীতির পিছনে বহু শতাব্দীর লোকবিশ্বাস ও সামাজিক পরিবর্তনের ছাপ থাকতে পারে।

তবে এই প্রথাকে সম্মান করার পাশাপাশি যৌনপল্লিতে বসবাসকারী মানুষদের সম্পর্কে কোনো অবমাননাকর ধারণা তৈরি করাও উচিত নয়। তাঁদের পেশা বা সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁদের মানবিক মর্যাদা কমে যায় না।

শেষ কথা

দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রথা বাংলার অন্যতম আলোচিত লোকাচার। এর সঙ্গে ‘পুণ্যমাটি’ নামটি জড়িয়ে রয়েছে এবং এর পিছনে রয়েছে নানা প্রচলিত গল্প ও সামাজিক ব্যাখ্যা।

তবে বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি সর্বত্র একইভাবে পালিত হয় না এবং এর সঙ্গে যুক্ত সব গল্পকে প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় ইতিহাস হিসেবে দেখা উচিত নয়।

ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও ইতিহাসকে আলাদা করে দেখলে ‘পুণ্যমাটি’র গল্পটি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।

দুর্গাপুজোর প্রতিমা যেমন দেবীশক্তির প্রতীক, তেমনই তার নির্মাণের নানা রীতিতে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির বহু পুরনো স্মৃতিও লুকিয়ে রয়েছে।

Syed Mosharaf Hossain
Syed Mosharaf Hossainhttps://syedmosharafhossain.in/
Syed Mosharaf Hossain is a visionary educator, technical innovator, and the Ex-Principal of Purbasthali-II Government ITI, West Bengal. An Electronics & Communication Engineer, he is the creator of the internationally recognized "Arduino-based Smart Shoe" for women’s safety, featured in the World Book of Records. As the Founder of SD ONUPRON GROUP, Syed has over six years of expertise in SEO, web development, and digital journalism. Honored as the "Principal of the Year" at the Asia Education Conclave 2025, he remains dedicated to driving technical innovation and mentoring future professionals in India's education sector.

Read more

Local News