সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
Smit Machchhar: দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী একটি ফ্লাইদুবাই বিমানে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঘটে যায় ভয়াবহ এক ঘটনা। মাঝআকাশে ককপিটের ভিতরে সহ-পাইলটের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার (Smit Machchhar)। কিন্তু নিজের জীবন বিপন্ন থাকা সত্ত্বেও তিনি যে সিদ্ধান্ত নেন, তা বিমানে থাকা ১৭৪ জনের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুজনেই ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়েছে।
বিমানটি যখন আকাশে প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল, তখন ককপিটে হঠাৎ দুই পাইলটের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহ-পাইলট ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাটি ঠিক কী কারণে শুরু হয়েছিল, তা এখনও তদন্তাধীন।
ঘটনার সময় বিমানটি খুব দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করে। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুটের মতো উচ্চতা হারায়। পরে জরুরি সংকেত পাঠানো হয়।
গুরুতর আহত হয়েও ককপিটের দরজা খুলে দেন স্মিত
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের সিদ্ধান্ত।
আক্রমণে গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও তিনি ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন। ফলে বিমানের কেবিন ক্রু এবং কয়েকজন যাত্রী ককপিটে ঢোকার সুযোগ পান। তাঁরা আক্রমণকারী সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। বিমানে থাকা অন্য পাইলটরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। পরে যাত্রীদের অন্য বিমানে ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়া হয়।
কে এই ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার?
স্মিত মাচ্ছার মুম্বইয়ের বাসিন্দা একজন ভারতীয় বাণিজ্যিক পাইলট। তাঁর বিমান চালানোর ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার গল্পটিও বেশ অন্যরকম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছোটবেলায় পাইলট হওয়া তাঁর পরিকল্পনা ছিল না। পরিবারের টেক্সটাইল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য তিনি প্রথমে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময় একটি এভিয়েশন সেমিনারে অংশ নিয়ে বিমান চালানোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ১৯ বছর।
এরপর তিনি নিউজিল্যান্ডে পাইলট প্রশিক্ষণ নেন। পরে ভারতের বেসরকারি বিমান সংস্থা SpiceJet-এ দীর্ঘ সময় কাজ করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর SpiceJet-এ প্রায় ১১ বছরের কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালে তিনি Flydubai-তে যোগ দেন এবং Boeing 737 সিরিজের বিমানে ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তাঁর পেশাগত প্রোফাইল অনুযায়ী, Boeing 737-800 ও 737 MAX 8-এ তাঁর প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বিমানের যাত্রীদের মধ্যেও ছিলেন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি
শুধু ক্যাপ্টেন মাচ্ছার নন, বিমানে থাকা আরও কয়েকজন যাত্রীও পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানে কয়েকজন অফ-ডিউটি পাইলট ছিলেন, যাঁরা ককপিটে ঢুকে বিমান নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেন। এছাড়া ইসরায়েলি দন্তচিকিৎসক ড. শোটা মুসায়েভ আহত ক্যাপ্টেনের প্রাথমিক চিকিৎসায় সাহায্য করেন এবং রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, ঘটনাটি শুধুমাত্র একজনের সাহসিকতার গল্প নয়। ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কেবিন ক্রু, যাত্রী এবং অন্য পাইলটদের সম্মিলিত পদক্ষেপও বিমানটিকে নিরাপদে নামিয়ে আনতে সাহায্য করে।
কেন হামলা হয়েছিল?
এই প্রশ্নটির চূড়ান্ত উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
প্রথমদিকে ঘটনাটিকে সম্ভাব্য হাইজ্যাক বা বিমান ছিনতাইয়ের আশঙ্কা হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিমানটি জরুরি সংকেতও পাঠিয়েছিল। তবে পরবর্তী রিপোর্টে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে সরাসরি প্রচলিত অর্থে হাইজ্যাকিং হিসেবে বর্ণনা না করে ককপিটে সংঘর্ষ ও বিমান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার ঘটনা হিসেবে তদন্তের কথা জানিয়েছেন। সহ-পাইলটের উদ্দেশ্য এবং হামলার প্রকৃত কারণ তদন্তাধীন।
তাই হামলার পেছনে রাজনৈতিক, সন্ত্রাসবাদী বা ব্যক্তিগত কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল বলে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না।
কীভাবে শেষ পর্যন্ত সবাই বেঁচে গেলেন?
ঘটনার ধারাবাহিকতা মোটামুটি এমন ছিল:
দুবাই → তেল আভিভগামী ফ্লাইট → ককপিটে হামলা → ক্যাপ্টেন গুরুতর আহত → বিমান দ্রুত উচ্চতা হারায় → ককপিটের দরজা খোলা হয় → যাত্রী ও ক্রু ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনে → অন্য পাইলটরা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেন → তাবুকে জরুরি অবতরণ → ১৭৪ যাত্রীর নিরাপদ উদ্ধার।
মোদী ও নেতানিয়াহুর প্রশংসা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ১ অক্টোবর ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গুরুতর আহত অবস্থাতেও অন্যদের জীবন রক্ষার জন্য তাঁর দৃঢ়তা ও সাহস একটি বড় বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে। মোদী তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও মাচ্ছারকে প্রশংসা করে বলেন, গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি প্রতিরোধ করেন এবং ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যমে যাত্রী ও ক্রুদের হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সুযোগ করে দেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি বার্তা প্রকাশ করা হয়। আপনার দেওয়া ছবিতেও “Thank you, Captain Smit Machchhar” এবং তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়েছে।
বর্তমানে কেমন আছেন ক্যাপ্টেন স্মিত?
ঘটনার পর ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে সৌদি আরবের তাবুকের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি স্থিতিশীল অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
তাঁর দ্রুত আরোগ্যের জন্য ভারত, ইসরায়েল এবং বিভিন্ন মহল থেকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।
একজন পাইলটের দায়িত্ব শুধু বিমান চালানো নয়
ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, বিমান চালানোর পেশায় প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সংকটের মুহূর্তে দায়িত্ববোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
মাঝআকাশে নিজের জীবন যখন ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে, তখনও তিনি ককপিটের দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের ফলে অন্যরা ককপিটে পৌঁছাতে পেরেছিলেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ তৈরি হয়।
