সম্পাদনা সংক্রান্ত ঘোষণা: West Bengal Times প্রকাশের আগে সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে। পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের টিম স্বাধীন গবেষণা ও বিশ্লেষণও করে থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পুনরায় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
Election Commission 14 Objections: ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত প্রায় ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। বিষয়গুলির মধ্যে ছিল নতুন ভোটারদের Form 6, ভোটার তালিকার ডিজিটাল ডেটাবেস, SIR-সংক্রান্ত কাজ এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিরুদ্ধে করা ১৬.১০ লক্ষ আপিল।
এই অভিযোগগুলির পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও নিজের অবস্থান জানিয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রেস নোটে ECI বলেছে, কমিশনের সদস্যদের মধ্যে লিখিত পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও মতপার্থক্য স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক deliberation-এর অংশ। কমিশনের দাবি, গত এক বছরে নেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই হয়েছে।
অর্থাৎ, সামনে এখন দুটি আলাদা বিষয় রয়েছে: দুই কমিশনারের নথিভুক্ত আপত্তি এবং নির্বাচন কমিশনের দাবি যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল।
Election Commission 14 Objections: Form 6 নিয়ে প্রথম প্রশ্ন
নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার জন্য যে Form 6 পূরণ করতে হয়, সেটিকে ঘিরেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি সামনে এসেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে অনলাইন Form 6-এ SIR-সংক্রান্ত একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত করা হয়। নতুন ভোটারকে জানাতে হচ্ছিল, তাঁর নিজের নাম অথবা তাঁর বাবা-মা বা দাদা-দিদা/ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না। প্রশ্নটির উত্তর না দিলে আবেদন এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবেক যোশী আগে এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধি পরিবর্তন না করে Form 6-এ এই ধরনের পরিবর্তন আনা যায় না।
পরে সুখবীর সিং সান্ধুও আপত্তি জানান। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট তিনি পরিবর্তনটিকে “unauthorised and illegal” বলে উল্লেখ করে তা দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু প্রশ্নটি সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ পর্যন্ত Form 6-এ ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তাহলে ১৪টি আপত্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি অনলাইন ফর্মের পরিবর্তন নিয়ে নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, দুই কমিশনারের আপত্তিগুলি চারটি বড় ক্ষেত্রকে ছুঁয়েছে:
- নতুন ভোটার নথিভুক্তির পদ্ধতি
- ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল
- ভোটার তালিকার ডিজিটাল ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ
- পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আপিল
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ মাসের মধ্যে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানানো হয়েছিল এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে একই দিনে একাধিক আপত্তিও নথিভুক্ত হয়।
Election Commission 14 Objections: ভোটার তালিকার ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আপত্তি
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ERONet ও ECINet-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থায় ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দুই কমিশনার ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় স্তরে, বিশেষ করে দিল্লির IT ব্যবস্থার দিকে কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, স্থানীয় পর্যায়ে আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত Electoral Registration Officers বা ERO-দের ভোটার তালিকায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার ক্ষমতা বা প্রবেশাধিকার সীমিত হতে পারে।
বিবেক যোশী নাকি এমন একটি প্রযুক্তিগত অডিটের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে সংশ্লিষ্ট statutory authorities ছাড়া অন্য কেউ ভোটার ডেটাবেসে পরিবর্তন করতে পারছেন না।
এই অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ECINet-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কঠোর data-security protocols, IT security checks এবং audit controls-এর অধীনে পরিচালিত হয়। ERO এবং District Election Officer-রা আইনের অধীনে তাঁদের নির্ধারিত ক্ষমতা অনুযায়ী ভোটার তালিকা পরিচালনা করেন বলেও ECI জানিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ১৬.১০ লক্ষ আপিল কোথা থেকে এল?
বিতর্কের আরেকটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের SIR-পরবর্তী ভোটার তালিকা।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মোট ৩৮.৩১ লক্ষ আপিল জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২২.২১ লক্ষ আপিল করা হয়েছে বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। অন্যদিকে ১৬.১০ লক্ষ আপিল করা হয়েছে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে।
এই ১৬.১০ লক্ষ আপিল নিয়েই সুখবীর সিং সান্ধু প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তিনি জানতে চেয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের হয়ে এই আপিলগুলি করার অনুমতি কে দিয়েছিলেন এবং বাস্তবে কে বা কারা সেগুলি দায়ের করেছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাঁর নোট অনুযায়ী, তিনি, বিবেক যোশী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি: ১৬.১০ লক্ষ আপিলের সংখ্যাটি নির্বাচন কমিশনের আদালতে দেওয়া তথ্যের অংশ। কিন্তু কে এই আপিল করার অনুমতি দিয়েছিল, সেই প্রশ্নটি অভ্যন্তরীণ নোটে তোলা হয়েছে।
২০২৩ সালের আইনের ১৮(২) ধারায় কী বলা আছে?
এই বিতর্কের কেন্দ্রীয় আইনি বিষয়গুলির একটি হল Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act, 2023-এর Section 18।
এই ধারার ১৮(১) অনুযায়ী, কমিশন তার কাজের পদ্ধতি ও সদস্যদের মধ্যে কাজের বণ্টন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারে।
আর ১৮(২)-এ বলা হয়েছে, কমিশনের কাজ যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে পরিচালিত হবে। কিন্তু সদস্যদের মধ্যে কোনও বিষয়ে মতভেদ হলে সেই বিষয়টি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।
তাই তিন সদস্যের কমিশনে দুই সদস্যের একই মত থাকলে, আনুষ্ঠানিকভাবে সেই মত সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: কোনও কমিশনারের লিখিত আপত্তি থাকা এবং কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে পূর্ণ কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এক জিনিস নয়।
অতএব, ১৪টি আপত্তির প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই কমিশনারের আপত্তি আনুষ্ঠানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের নথি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া দেখতে হবে।
কমিশনের নামে নির্দেশ জারি নিয়েও প্রশ্ন
দুই কমিশনারের নোটে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেটি হল, কমিশনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই কমিশনের নামে কিছু যোগাযোগ বা নির্দেশ জারি হওয়ার অভিযোগ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিল সান্ধু এবং ২৪ এপ্রিল যোশী কমিশনের কর্মকর্তাদের কাছে আলাদা নোটে এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, কমিশনের নামে কোনও যোগাযোগ জারি করার আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকা উচিত।
এই বিষয়টিও ২০২৩ সালের আইনের Section 18-এর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, কারণ ওই ধারায় কমিশনের কাজের পদ্ধতি ও দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়ে নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে।
ELECTION COMMISSION OF INDIA OFFICIEL NOTICE: DOWNLOAD PDF
Election Commission 14 Objections: নির্বাচন কমিশনের পাল্টা বক্তব্য
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ২৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন একটি প্রেস নোট প্রকাশ করে।
ECI বলেছে, কমিশন একটি multi-member constitutional body এবং written notes, observations, technical suggestions ও internal checks and balances তার স্বাভাবিক কাজের অংশ। কোনও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয় বলেও কমিশন জানিয়েছে।
কমিশনের আরও দাবি, গত এক বছরে প্রায় ৪০টি নতুন উদ্যোগ, নির্বাচনী সংস্কার এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। SIR-সহ এসব সিদ্ধান্তকে ECI পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করেছে।
অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই কমিশনারের নোটগুলিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক dissent হিসেবে দেখা ঠিক নয়; এগুলি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে স্বাভাবিক internal deliberation-এর অংশ।
আরও পড়ুন: সরকারি অফিসের চেয়ারে সাদা তোয়ালে কেন থাকে? জানুন আসল কারণ ও ইতিহাস
তাহলে আসল প্রশ্ন কোথায়?
এখন বিতর্কের মূল জায়গাটি হল লিখিত আপত্তি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যকার প্রক্রিয়া।
যদি কোনও বিষয়ে দুই কমিশনার আপত্তি জানিয়ে থাকেন, তাহলে সেই আপত্তির পরে কী হয়েছিল? সংশ্লিষ্ট বিষয়টি কি পূর্ণ কমিশনের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্তের জন্য রাখা হয়েছিল? যদি রাখা হয়ে থাকে, সিদ্ধান্ত কীভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল? আর যদি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তার ভিত্তি কী ছিল?
একইভাবে, Form 6-এ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আপত্তি নথিভুক্ত হওয়ার পরও কেন সেটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বহাল ছিল, কিংবা পশ্চিমবঙ্গের ১৬.১০ লক্ষ আপিলের ক্ষেত্রে অনুমোদন ও দায়িত্বের কাঠামো কী ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি থেকেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পাওয়া যাবে।
এখানে সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ব্যাখ্যাকে আলাদা করে দেখা জরুরি। বর্তমানে প্রকাশিত তথ্য থেকে অভ্যন্তরীণ আপত্তির অস্তিত্ব এবং ECI-এর পাল্টা ব্যাখ্যা দুটিই স্পষ্ট, কিন্তু প্রতিটি আপত্তির পর কীভাবে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার সম্পূর্ণ নথি প্রকাশ্যে না থাকলে প্রতিটি ঘটনার চূড়ান্ত আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
Election Commission 14 Objections: কেন এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ?
ভোটার তালিকা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। নতুন ভোটারের নাম যোগ করা, কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, ভুল সংশোধন করা এবং আপিলের সুযোগ দেওয়া, প্রতিটি ধাপেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই Form 6-এর পরিবর্তন, ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার, ERO-দের ভূমিকা এবং পশ্চিমবঙ্গে ১৬.১০ লক্ষ আপিলের মতো বিষয়গুলি নিয়ে প্রকাশিত নথি ও কমিশনের ব্যাখ্যা এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর নির্ভর করবে কোন সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল, কী অনুমোদন ছিল এবং সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল, তার উপর।
